বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বিগত সময়ে কিছু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে। দুর্নীতি কিংবা অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যেসব প্রকল্প এসেছে সেগুলো শনাক্ত করবে আইএমইডি (বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ)। তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রকল্পের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আগামী দিনের বাংলাদেশের উন্নয়নের যে চিত্র সেখানেও আশা করি তার প্রতিফলন পাওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা মনে করি এ প্রকল্পগুলো নতুনভাবে হবে। কারণ, সেগুলো তো সময়মতো শেষ করতে হবে। যেগুলো আমরা বিগত দিন থেকে পেয়েছি এই অসমাপ্ত কাজগুলো কতটুকু সমাপ্ত করবো সেগুলো রিভিউয়ের মাধ্যমে সমাধান হবে। যেগুলোর আসলে প্রয়োজনীয়তা নেই সেগুলো বাদ দেওয়া হবে। যেগুলো বরাদ্দ দেওয়ার তা দেওয়া হয়েছে বাকিগুলো তদন্ত করেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এমআরটি লাইন-১ এর (পাতাল) বরাদ্দ ৭৩৫০ কোটি টাকা
দেশের প্রথম পাতাল রেল বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর ও নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে। চলমান এ প্রকল্পে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছর তিন হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ফলে দেশের প্রথম পাতাল রেলে বরাদ্দ এবার বাড়লো।
২০২৬ সালের মধ্যে ৫২ হাজার ৫৬১ দশমিক ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর ও পূর্বাচল থেকে নতুনবাজার পর্যন্ত মাটির নিচ দিয়ে ও এলিভেটেড- উভয় সুবিধা সম্বলিত এমআরটি লাইন-১ নির্মাণ করা হবে।
বাকি তিনটির কী হবে আমি জানি না। আমি আছি আর কয়েকদিন। এ বিষয়ে কিছু বলবো না। তিনটি মেট্রোরেলের ভাগ্য কী হবে কিছুই জানি না।-ডিএমটিসিএলের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আব্দুল বাকী মিয়া
প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী এমআরটি লাইন-১ এর দুটি অংশ থাকবে। যার একটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত (বিমানবন্দর রুট) ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার অংশ। এটি হবে ভূগর্ভস্থ। এতে ১২টি স্টেশন থাকবে।
অন্য অংশটি নতুনবাজার থেকে প্রায় ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার এলিভেটেড লাইনসহ পূর্বাচল পর্যন্ত (পূর্বাচল রুট)। এতে সাতটি স্টেশন থাকবে।
এমআরটি লাইন-১ এর ডিজাইন/সংগৃহীত
বিমানবন্দর রুটের অংশ হিসেবে নতুনবাজার ও নদ্দা স্টেশন হবে ভূগর্ভস্থ। বাংলাদেশ সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জাইকা) এমআরটি লাইন-১ এর নির্মাণকাজের ব্যয়ভার বহন করবে।
এর মধ্যে জাইকা প্রকল্প সহায়তা (পিএ) হিসেবে দেবে ৩৯ হাজার ৪৫০ দশমিক ৩২ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার দেবে ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা। জাপানি ফার্মের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম বিমানবন্দর-কমলাপুর-পূর্বাচল মেট্রো লাইন নির্মাণকাজ তদারকি করবে।
এর আগে ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৫২ হাজার ৫৬১ দশমিক ৪৩ কোটি টাকায় এমআরটি লাইন-১ প্রকল্প অনুমোদন দেয়।
এমআরটি-৬ প্রকল্পে (অসমাপ্ত) ১ হাজার ৮৯৯ কোটি বরাদ্দ
মেট্রোরেল লাইন এমআরটি-৬ (মতিঝিল থেকে কমলাপুর) প্রকল্পে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন একেবারে শেষ পর্যায়ে। গত সংশোধিত এডিপিতে ১ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে নতুন এডিপিতে প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ বাড়ানো হলো।
এমআরটি-৫, নর্দান রুটে (পাতাল) বরাদ্দ ৩৯০৯ কোটি টাকা
মেট্রোরেল লাইন এমআরটি-৫ (নর্দান) প্রকল্পের আওতায় পাতাল রেল নির্মাণ করা হবে। কাজ এগিয়ে নিতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। অথচ প্রকল্পের আওতায় গত সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৮৬৮ কোটি টাকা।
এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ হবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় পাতাল মেট্রোরেল। প্রকল্পটি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে রাজধানীর ভাটারা পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাতাল এবং ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়ালসহ মোট ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন নির্মাণ হবে। যাত্রী ওঠা-নামার জন্য ১৪টি স্টেশন (৯টি পাতাল ও ৫টি উড়াল) থাকবে। প্রকল্পটির কাজ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এ প্রকল্পেও ঋণসহায়তা দিচ্ছে জাইকা।
বাকিগুলো প্রাথমিক ধাপে আছে। আমরা প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব করতে পারি কিন্তু সিদ্ধান্ত কী হবে সরকার নেবে। সিদ্ধান্ত কী হয়েছে আমরা জানি না।-ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. শাওগাতুল আলমের একান্ত সচিব (উপসচিব) মো. জাহিদুল ইসলাম
এমআরটি লাইন-৫ এর রুট অ্যালাইনমেন্ট হলো— হেমায়েতপুর-বলিয়ারপুর-বিলামালিয়া-আমিনবাজার ও গাবতলী। সেখান থেকে দারুস সালাম-মিরপুর-১-মিরপুর-১০-মিরপুর-১৪ ও কচুক্ষেত হয়ে যাবে বনানী। এরপর গুলশান-২ ও নতুনবাজার হয়ে লাইনটি যাবে ভাটারায়। যার মধ্যে হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার ও ভাটারা অংশে উড়ালপথ আর গাবতলী থেকে নতুনবাজার অংশে থাকবে পাতাল সংযোগ।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানায়, মেট্রোরেল হলো ঢাকার একটি দ্রুতগামী গণপরিবহন ব্যবস্থা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড। জাইকা ও ডিএমটিসিএল ২০৩০ সাল নাগাদ ১২৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মোট ছয়টি মেট্রো লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এই নেটওয়ার্কে ৫১টি উড়াল স্টেশন ও ৫৩টি ভূগর্ভস্থ স্টেশন থাকবে।
ছয়টি লাইন মিলিতভাবে দিনে ৪৭ লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকায় মোট ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো হলো— এমআরটি লাইন-১, এমআরটি লাইন-২, এমআরটি লাইন-৪, এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) এবং এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট)। এর মধ্যে একটির কাজ শেষের পথে (লাইন-৬)। এটিসহ তিনটি মেট্রোরেলে বরাদ্দ মিলেছে।
ঝুলে গেলো ৩ মেট্রো প্রকল্প
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ না দেওয়ায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে এমআরটি-৫ সাউর্দান, এমআরটি-২ ও এমআরটি-৪ প্রকল্প।
এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট হলো ঢাকার দ্বিতীয় পূর্ব-পশ্চিম সংযোগকারী অনুমোদিত মেট্রোরেল প্রকল্প। গাবতলী থেকে আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে ১১টি পাতাল ও চারটি উড়াল স্টেশন থাকার কথা রয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ৪৭ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা।
এমআরটি লাইন-২ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রস্তাবিত এ রুটের দৈর্ঘ্য ছিল ৩৫ কিলোমিটার। নির্মাণের জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীসময়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) হালনাগাদ কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে রুটটি গাবতলী থেকে ডেমরা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।
এ রুটের দৈর্ঘ্য ২৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার। গাবতলী থেকে শুরু হয়ে ঢাকা উদ্যান, বসিলা মোড়, মোহাম্মদপুর বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড, নয়াবাজার, ধোলাইখাল, দয়াগঞ্জ, কাজলা, ডেমরা হয়ে তারাবো বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যাবে এ মেট্রো লাইন।
এমআরটি-৪ রুটটি কমলাপুর থেকে শুরু হয়ে সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী-শনির আখড়া-সাইনবোর্ড-চট্টগ্রাম রোড দিয়ে শেষ হবে নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে। মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য হবে ১৬ কিলোমিটার। এটি বাস্তবায়নে প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
এই তিন মেট্রোরেল প্রকল্পের কী হবে জানতে চাইলে ডিএমটিসিএলের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আব্দুল বাকী মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাকি তিনটির কী হবে আমি জানি না। আমি আছি আর কয়েকদিন। এ বিষয়ে কিছু বলবো না। তিনটি মেট্রোরেলের ভাগ্য কী হবে কিছুই জানি না।’
এ বিষয়ে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. শাওগাতুল আলমের একান্ত সচিব (উপসচিব) মো. জাহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বাকিগুলো প্রাথমিক ধাপে আছে। আমরা প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব করতে পারি কিন্তু সিদ্ধান্ত কী হবে সরকার নেবে। সিদ্ধান্ত কী হয়েছে আমরা জানি না।'