বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে বহুদিনের আলোচিত বাস্তবতা ‘ক্যাডার রাজা প্রশাসন’। মাঠ প্রশাসন থেকে সচিবালয়, পদোন্নতি থেকে নীতিনির্ধারণে প্রায় সর্বত্রই প্রশাসন ক্যাডারের কর্তৃত্ব দৃশ্যমান। ফলে একই রাষ্ট্রযন্ত্রে কাজ করেও অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অনেকেই নিজেদের ‘চুনোপুঁটি’ বলেই মনে করেন। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রকৌশল কিংবা তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হলেও বাস্তবে নানা সিদ্ধান্তে নির্ভর করতে হয় প্রশাসন ক্যাডারের ওপর। এতে যেমন আন্তঃক্যাডার বৈষম্য বাড়ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে হতাশা, হীনম্মন্যতা ও কর্মস্পৃহাহীনতা। অন্যদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দ্রুত পদোন্নতি, প্রটোকল সুবিধা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও ঘুরেফিরে আসছে প্রশাসন ক্যাডার ঘিরে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীর মতো বিশেষায়িত পেশার কর্মকর্তারাও নিজ ক্যাডার ছেড়ে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিতে আগ্রহী হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের এই বৈষম্য শুধু প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং দক্ষ মানবসম্পদের সুষম ব্যবহারের পথও সংকুচিত করছে।
অন্যদিকে বাড়ছে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে নৈতিক স্খলন, ঘুষ গ্রহণ, সরকারি কোষাগারের টাকা জমা না দেওয়া অন্যতম। আছে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার মতো অভিযোগ। ব্যক্তিগত তথ্য গোপন করে পদ-পদবি আদায় এবং বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগও এন্তার।
রাজনৈতিক যোগাযোগের বেশি অভিযোগ রয়েছে প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। ভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসন ক্যাডারের কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের অধীনে কাজ করতে হয়। এতে হীনম্মন্যতা তৈরি হয়, নষ্ট হয় কর্মস্পৃহা।
প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে অন্য ক্যাডারের বৈষম্য শুধু ব্যক্তিগত অসন্তোষের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর একটি দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিশেষ করে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরকারের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন সমন্বয়, ভূমি প্রশাসন, নির্বাচন, ত্রাণ, মোবাইল কোর্টসহ বহু দায়িত্ব তাদের হাতে থাকে। অন্যদিকে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রকৌশল বা প্রাণিসম্পদ ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিজ নিজ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হলেও মাঠ পর্যায়ে তাদের অনেক সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এসব বিশোষিত ক্যাডারের কাজেও সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা দেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। ক্ষেত্রবিশেষে প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও তারা পালন করেন দায়িত্ব। পদোন্নতি, গাড়ি, বাড়ি সুবিধাসহ নানা কারণে এগিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য বা তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা অনেক সময় দীর্ঘ বছর একই স্তরে আটকে থাকেন। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোয় প্রশাসন ক্যাডারের আধিপত্য বেশি দেখা যায়। ফলে জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের প্রভাবও বেশি।
বিসিএসের ২৬ ক্যাডারের ১৪টি সাধারণ এবং ১২টি কারিগরি। প্রকৌশলীরা নিয়োগ পান রেল (প্রকৌশল), সওজ, গণপূর্ত, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ক্যাডারে। তথ্য এবং খাদ্য ক্যাডারে কিছু পদ রয়েছে প্রকৌশলীদের জন্য। বঞ্চনার অভিযোগ করে প্রকৌশলীরা বলেছেন, সরকার পরিচালনায় যুক্ত থাকার সুবিধা নিয়ে প্রশাসন ক্যাডার এবং রাজনৈতিক কারণে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা পুলিশ ক্যাডার পদ ছাড়াই ব্যাচ ধরে পদোন্নতি পাচ্ছে। বাকিরা নির্বাচন ও রাজনীতিতে তেমন কাজে লাগে না বলে শর্ত পূরণেও পদোন্নতি হয় না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের সুযোগ কম পান ভিন্ন ক্যাডারের লোকজন। যেমন চিকিৎসক বা কৃষিবিদ তার সেক্টরে ধারণা রাখলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তার প্রভাব বেশি থাকায় কারিগরি মতামত অনেক সময় গুরুত্ব হারায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া মাঠ পর্যায়ে ডিসি বা ইউএনও সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত ক্ষমতাধর অবস্থানে থাকেন। সরকারি অনুষ্ঠান, স্থানীয় রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা, এমনকি সামাজিক যোগাযোগেও তাদের গুরুত্ব বেশি। অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা একই গ্রেডে চাকরি করলেও বাস্তবে সেই ধরনের প্রভাব বা প্রটোকল পান না। অনেক প্রকল্পে কারিগরি কর্মকর্তারা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকলেও অর্থ ছাড়, প্রশাসনিক অনুমোদন বা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের ওপর নির্ভরতা থাকে।
নিজের ক্যাডার ছেড়ে এমবিসিএস ডাক্তার কিংবা বুয়েটে থেকে পাস করা প্রকৌশলী চলে যাচ্ছেন প্রশাসন ক্যাডারে। কারণ দ্রুত পদোন্নতির সম্ভাবনা, প্রশাসনে ক্ষমতা, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ ও সামাজিক মর্যাদা। প্রশাসন ক্যাডারে আগ্রহ মূলত ক্ষমতা, নীতিনির্ধারণী ভূমিকা, পদোন্নতির সুযোগের ফলে। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য, কৃষি বা প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা নিজ নিজ দপ্তরের প্রযুক্তিগত বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বাজেট বরাদ্দ, বা স্থানীয় সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ইউএনও-নির্ভরতা অনেক বেশি। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা তুলনামূলকভাবে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে (যেমন ডিসি, সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তর) পৌঁছাতে পারেন। অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে একই স্তরের নীতিনির্ধারণী পদে পৌঁছানো তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ ও সীমিত।
এদিকে সরকারি গাড়িসহ রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের অভিযোগ আসছে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। প্রেষণে প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও অনিয়মের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে। এতে ক্ষুণ্ন হচ্ছে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি। কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সেবাপ্রত্যাশী মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউএনও, এসিল্যান্ড ও ডিসিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ বেশি উঠছে। কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রবণতা ও স্বেচ্ছাচারিতার লাগাম টানতে বিভিন্ন সময়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি ঘটছে না।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও পদায়নে দলপ্রীতির কারণে সরকারের মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়মিত বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও মাঠ প্রশাসনে কর্মরত প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিঞা আমাদের সময়কে বলেন, কর্মকর্তাদের অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির বড় কারণ আইন শিথিল করা। আগের আইনে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ হলে ছিল চাকরিচ্যুতি আর এখন তিরস্কার। শুধু তাই নয়, একাধিকবার এ অপরাধ করলেও তিরস্কার। এরকম নমনীয় আইনের কারণে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। শ্লীলতাহানির মতো অপরাধ প্রমাণিত হলেও এক বছর পর চাকরিতে যোগ দেওয়া যাবে। এসব কারণে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। দ্রুত আইনের সংশোধন করা দরকার।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন অংশীজনের নানা রকম ‘অযাচিত’ তদবির ও আবদার সামলাতে হয়। এগুলো নিয়েই বেশি সমস্যা তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ বেশি উঠে। বিভিন্ন অভিযোগে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। গুরুদণ্ড ও লঘুদণ্ড দেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে। তবে সর্বোচ্চ শাস্তি বা চাকরিচ্যুতির নজির কম।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাঠপর্যায়ে ইউএনও বা ডিসি হয়ে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত পদোন্নতি, সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নিয়োগের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রতিনিধিত্বের অবারিত সুযোগ পান প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। একই ব্যাচ বা সিনিয়র হলেও অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রশাসন ক্যাডারের নির্দেশ বা পরামর্শ মানতে বাধ্য হন। এসব কারণে তরুণ কর্মকর্তার মধ্যে অহমিকা ও দাপট দেখা যায়। এর জেরে অনেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এ জন্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নৈতিকতা। প্রশিক্ষণ মডিউলে নৈতিকতা, আচরণবিজ্ঞানসহ আরও কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
তথ্যমতে, প্রশাসন ও পুলিশে পদ ছাড়া পদোন্নতি হলেও বিসিএস প্রকৌশল ক্যাডারগুলোর চিত্র ভিন্ন। পদ থাকলেও পদোন্নতি হয় না শর্তের বেড়াজালে। রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরে সচিব সমমর্যাদার গ্রেড-১ পদ থাকলেও সেগুলো শূন্য। রেল এবং সওজে অতিরিক্ত সচিব সমমর্যাদার গ্রেড-২ পদগুলোও খালি। বিচারপতি নাইমা হায়দার এবং বিচারপতি মোস্তফা জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চের ২০১৯ সালের ১২ মে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, একটি ক্যাডারে উচ্চ গ্রেড এবং পদোন্নতিপ্রাপ্তি সহজতর। অন্য ক্যাডাররা পিছিয়ে পড়ছে, যা সংবিধানের ২৯ (১) অনুচ্ছদের পরিপন্থি।
সড়কও জনপথ অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসেসিয়েশনের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী একিউএম ইকরাম উল্লাহ এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, প্রশাসনের ওপর পড়াশোনা না করে প্রশাসন ক্যাডার। আবার প্রকৌশলী বা চিকিৎসক না হয়েও বিশেষায়িত খাতের প্রধান হন প্রশাসন ক্যাডারের ব্যক্তিরা। ওই খাতের মান ভালো করাও কঠিন। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিরা শীর্ষ পদ যেন পান। তা করা হয় না। এটি কেবল বৈষম্যের বিষয় নয়। তাছাড়া বদলি-পদোন্নতি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে প্রশাসনের লোকজন। এ নিয়ে মন্তব্য করলেও বিরাগভাজন হতে হয়। সাধারণত প্রশাসনের লোকজন খুব কম অনিয়মের শাস্তি পান। ধরা পড়ে গেলে বলা হয়, হতে পারে। অন্য ক্যাডারের ক্ষেত্রে হলে ভিন্নচিত্র। ক্লাসের পেছনের কাতারের ছাত্ররা প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধর হলে বাকিরা তার দিকে ঝুঁকবে এটাই স্বাভাবিক। নিজ ক্যাডার ছেড়ে সেখানে যেতে চাওয়ার এটা একটা কারণ হতে পারে।
প্রকৌশলীদের ভাষ্য, জনপ্রশাসন প্রশাসন ক্যাডার নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় প্রকৌশলীসহ সবার পদোন্নতি তাদের হাতে। প্রশাসন ক্যাডার নিজেরা পদ ছাড়াই, শর্ত শিথিল করে পদোন্নতি নিলেও বাকিদের ক্ষেত্রে কখনও নিয়োগবিধি, কখনও পদ খালি না থাকা আবার কখনও দুদকের ছাড়পত্র না থাকার কারণ দেখিয়ে আটকে দেয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, সেতু কর্তৃপক্ষ, বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে প্রকৌশলীরা কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ পেলেও তারা ক্যাডার কর্মকর্তা নন। সরকারি করপোরেশন ও কোম্পানিতেও প্রকৌশলীদের নিয়োগ হয়। নন-ক্যাডার প্রকৌশলীদের পদোন্নতির সুযোগ ক্যাডারদের তুলনায় আরও কম। সড়ক, সেতু, রেল, গণপূর্ত, পানি উন্নয়ন, টেলিযোগযোগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সরাসরি প্রকৌশল কাজের সঙ্গে যুক্ত। এসব মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব থেকে সচিব পদে নিয়োগ চান প্রকৌশলীরা। প্রকৌশল ক্যাডার সংগঠনগুলোর নেতারা বলেছেন, দীর্ঘ চাকরিতে তারা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তা কাজে লাগানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে নীতিনির্ধারণী পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ। কিন্তু পদোন্নতির সুযোগ না থাকায় দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগই পান না বলে অভিযোগ তাদের।
সরকার প্রকৌশল, চিকিৎসা ও কৃষিশিক্ষার জন্য সাধারণ শিক্ষার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় করে। এ ধরনের বিশেষায়িত ডিগ্রি নিয়ে তাদের কেউ কেউ চলে যাচ্ছেন বিসিএসের সাধারণ ক্যাডারগুলোয়। পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) বিসিএস পরীক্ষার আবেদনের সময় আগ্রহের ক্যাডার জানতে চায়। সাধারণত পরীক্ষার ফলে এগিয়ে থাকা চাকরিপ্রার্থীরা প্রশাসন, পররাষ্ট্র ও পুলিশ ক্যাডারে আগ্রহ বেশি দেখান। বিশেষায়িত বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট ক্যাডারে যান। সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, চিকিৎসা, প্রকৌশলবিদ্যার মতো বিশেষায়িত বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে চলে যাচ্ছেন।
পিএসসি থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ৩৫তম থেকে ৪০তম (চিকিৎসক নিয়োগের ৩৯তম বাদে) বিসিএস পর্যন্ত ৫টি বিসিএসে প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে ১ হাজার ৯৮০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্তত ৩৮৭ জন প্রকৌশলী ও চিকিৎসক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে আগেও চিকিৎসা ও প্রকৌশলবিদ্যায় পড়া কিছু কিছু শিক্ষার্থী যেতেন। তবে সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর কারণ, ওই তিন ক্যাডারে সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা বেশি। সম্প্রতি এসব ‘পছন্দের ক্যাডার’ বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারে যেতে নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে। নিজেদের সংশ্লিষ্ট ক্যাডারটিই বিলুপ্ত করে একীভূত হতে চান প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে। প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত হতে ২০১৮ সালে বিলুপ্ত হয়েছে অর্থনৈতিক (ইকোনমিক) ক্যাডার। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ক্যাডার কর্মকর্তারা তাদের বঞ্চনাকেই সামনে এনেছেন। তাদের অভিমতÑ পদ না থাকলেও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়মিত পদোন্নতি হয়। সরকারের রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী প্রতিটি ক্যাডার ও বিভাগের জন্য পৃথক দায়িত্ব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কাজের ক্ষমতাসংক্রান্ত একাধিক আইন ও বিধি রয়েছে। এরপরও ডিসিরা বিভিন্ন সময়ে অন্য ক্যাডার ও বিভাগের দায়িত্ব চেয়েছেন। ফলে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা হয়Ñ বাজার পরিস্থিতি নিয়ে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে হয় ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারদের। নিয়মানুযায়ী এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে তথ্যবিনিময় করবে বাণিজ্য ক্যাডার। এ ধরনের বৈষম্যের কারণে সবার কাছে প্রশাসন ক্যাডার আকর্ষণীয়।