ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার আক্রমণাত্মক কৌশল আবারও সামনে এসেছে। শুল্ক নীতি থেকে শুরু করে সামরিক সংঘাত—বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকাশ্য হুমকি, কঠোর ভাষা ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি নানা দেশের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করেছেন। তবে ইরানের ক্ষেত্রে এ কৌশল কার্যকর হচ্ছে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অচলাবস্থা আরও গভীর হচ্ছে এবং তা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
প্রায় ১১ সপ্তাহ ধরে চলা এ সংকটে ট্রাম্প ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবুও তিনি তার কূটনৈতিক অবস্থান নমনীয় করার কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং প্রকাশ্য বক্তব্যে ইরানকে বারবার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা তাই কমে যাচ্ছে। এর ফলে বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
ইরানের শাসকদের মানসিকতাও এ অচলাবস্থার বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির বহু শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন। ইরানের সামরিক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপরও নিজেদের জনগণের কাছে মর্যাদা বজায় রাখা দেশটির নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা এমন কোনো অবস্থান নিতে চায় না, যাতে আত্মসমর্পণের ভাবমূর্তি তৈরি হয়।
এদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর কৌশলগত প্রভাব বজায় রেখে ইরান এখনো দরকষাকষির শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ ইরানকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প এখনো সর্বোচ্চ দাবি, অনিশ্চয়তা, মিশ্র বার্তা ও কঠোর ভাষাভিত্তিক কূটনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এ সংঘাত থেকে এমনভাবে বের হতে চান, যেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা তেমন নয়। একইভাবে ইরানও সম্পূর্ণ পরাজয় মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক আলোচক রব ম্যালি বলেন, কোনো সরকারই আত্মসমর্পণ করেছে—এমন ধারণা জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারে না। তার মতে, এ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাই সমঝোতার বড় বাধা।
রব ম্যালি আরও উল্লেখ করেন, ট্রাম্প বর্তমানে অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যেও রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, অজনপ্রিয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় রিপাবলিকান পার্টিও চাপের মুখে রয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের কৌশলকে সঠিক বলেই দাবি করছে। মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একজন দক্ষ আলোচক এবং তার কৌশল এরই মধ্যে বহু ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। তার দাবি, ইরানই এখন সমঝোতার জন্য বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো তার প্রকাশ্য হুমকি। গত মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সতর্ক করেন, কোনো চুক্তি না হলে ইরানের ‘সভ্যতাই ধ্বংস’ করে দেওয়া হবে। পরে প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এ বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হয়েছিল এবং এটি কোনো সুপরিকল্পিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ ছিল না।
এরপরও ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ইরানের অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন। কখনো বলেছেন, ইরান ‘সমঝোতার জন্য অনুনয় করছে’, আবার কখনো ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছেন। কিন্তু তেহরান এসব বক্তব্য অস্বীকার করেছে। বরং ইরান নিজেদের টিকে থাকাকেই বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে এবং দাবি করছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের অতিরিক্ত কঠোর ভাষা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন উপদেষ্টা ডেনিস রস বলেন, প্রেসিডেন্টের কৌশলগত ধৈর্যের অভাব এবং বক্তব্যের অসংগতি তার নিজের বার্তাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগের কৌশল সফল হয়েছে—যেমন বাণিজ্য আলোচনায় বা ভেনেজুয়াকে ঘিরে মার্কিন পদক্ষেপে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের গভীর প্রভাব এবং দেশটির দীর্ঘ ঐতিহাসিক গৌরবের কারণে শুধু চাপ প্রয়োগ করে তাদের নতি স্বীকার করানো সম্ভব নয়।
বরং অনেক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পের হুমকি ইরানের নতুন নেতৃত্বকে আরও কঠোর অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক পদক্ষেপের কারণে তেহরানের মধ্যে ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থাও কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তা নেট সোয়ানসন বলেন, অনেকেই মনে করেন অতিরিক্ত চাপ দিলে ইরান আত্মসমর্পণ করবে, কিন্তু বাস্তবে ইরানের ক্ষেত্রে বিষয়টি এভাবে কাজ করে না।