Image description

কথিত ‘ম্যাগনেট পিলার’ পাওয়ার আশায় এক ব্যবসায়ীর নগদ ও স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ২০ কোটি টাকা ও ১৫ কোটি টাকার জমি প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাতের মামলায় বোনের হয়ে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যান এক নারী। ওই প্রক্সি আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

 

সোমবার (১৮ মে) দুপুরে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীন এ আদেশ দেন। এ মামলায় নিজেকে শারমিন আক্তার একা পরিচয় দেওয়া সেই নারী প্রকৃতপক্ষে তার বোন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার উপপরিদর্শক মাহবুবুল আলম কারাগারে যাওয়া সেই আসামি প্রকৃত আসামি কি না, যাচাই করতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।

 

শুনানিতে আসামি পক্ষে অ্যাডভোকেট মো. আলমগীর হোসাইন আদালতকে জানান, এই আসামি আসল আসামি নন। তিনি মূল আসামির পক্ষে প্রক্সি দিয়েছেন। এরপর আদালত বলেন, এটা গর্হিত অপরাধ। নথি দেখে আদেশ হবে জানিয়ে আদালত আদেশ অপেক্ষমাণ রাখেন।

 

পরবর্তীতে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এজলাসে আসেন বিচারক। তদন্ত কর্মকর্তা আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে বলেন, প্রতারণার এ মামলায় প্রধান আসামি মো. মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকিরের স্ত্রী এজাহারনামীয় ৩ নম্বর আসামি শারমিন আক্তার একা ও ১৪ নম্বর আসামি লাইলী শাহনাজ খুশি (একার মা) ওরফে মুন্নি গত ১২ মে আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

 

পরবর্তীতে ১৪ মে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এই আসামিকে প্রকৃত আসামি মনে করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। রিমান্ড শুনানিকালে মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী আদালতকে পৃথক আবেদন দিয়ে জানান, কাঠগড়ায় আসামি শারমিন আক্তার একা প্রকৃত পক্ষে আসামি নন। এই আসামি প্রকৃত পক্ষে শারমিন আক্তার একা কি না, তা যাচাইয়ের জন্য আসামির এনআইডি, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদপত্র ও ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতে পাঁচ দিনের রিমান্ড দরকার।

 

আসামির পক্ষে অ্যাডভোকেট অলমগীর হোসাইন আদালতকে বলেন, তিনি এ মামলায় আসামিই নন। তার রিমান্ড হতে পারে না। এই আসামি প্রকৃত আসামি নন। তার ভুল হয়েছে, আমরা ভুল স্বীকার করছি। এ ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ভিন্ন মামলা হতে পারে। তবে এ মামলায় রিমান্ডে নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। এ সময় আইনজীবী আদালতের কাছে এ মামলা থেকে আসামির অব্যাহতি চান। একইসঙ্গে জামিন চান।

 

বাদীপক্ষে অ্যাডভোকেট রকিবুল ইসলাম ও কাইয়ুম হোসেন নয়ন আসামির রিমান্ড চেয়ে শুনানি করেন। তারা আদালতকে বলেন, এ মামলায় আসামি রাসেলকে রিমান্ড নেওয়ার পর অনেক তথ্য বের হয়েছে। এরা সংঘবদ্ধ চক্রে, বাদীর টাকা, স্বর্ণ ও জমি সবকিছু আত্মসাৎ করেছে। আত্মসমর্পণ করার সময়ও প্রতারণা করেছে, তার বিরুদ্ধে আলাদা মামলা তো হবেই।

 

আদালত বাদী হয়ে মামলা করবে সেটা আলাদা বিষয়। তবে এ মামলায় জড়িত আছেন সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। আত্মসমর্পণ করার সময় যে প্রতারণা করেছেন সেটা বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতারণা। নিশ্চয়ই তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। এ সময় আদালত বলেন, যে আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করেছেন উনার সনদ বাতিল হওয়া দরকার।

 

বাদীপক্ষের আইনজীবীরা আরও বলেন, আসামিদের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে কেন সে সারেন্ডার করবে? অবশ্যই তারা চক্রের সঙ্গে জড়িত। তাদের কারণে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। পরে আদালত তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদেশ দেন।

 

আদালত সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় হংকংয়ে কাটানো ব্যাবসায়ী আজিজুল আলম কথিত ‘ম্যাগনেট পিলার’ পাওয়ার আশায় নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং আরও ১৫ কোটি টাকা মূল্যের জমি ‘কালো জাদু’র খপ্পরে পরে হারিয়েছেন বলে কথিত এক ফকিরসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করেন।

 

মামলার অভিযোগে এ তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে মিজান নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই চক্রের সঙ্গে পরিচয় হয় ওই ব্যবসায়ীর। চক্রের সদস্যরা তাকে জানায়, তাদের কাছে অলৌকিক ক্ষমতার প্রাচীন ম্যাগনেট পিলার আছে, যা বিদেশে ১০০ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি সম্ভব। প্রধাম আসামি সোহেল ফকির তার লেবাস ও চটকদার কথায় ব্যবসায়ীর বিশ্বাস অর্জন করেন।

 

তার দাবি, বিশ্বাস অর্জনের পর তাকে বিভিন্ন কুফরি কালাম ও শয়তানের নিশ্বাস ব্যবহার করে হিপনোটাইজ করা হয়। তাকে বিভিন্ন সময় মিষ্টি ও পানীয়র সঙ্গে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে তার মস্তিষ্ক বিকল করে দেওয়া হতো। এরপর থেকে তিনি চক্রটির অনুগত হয়ে পড়েন।

 

ভুক্তভোগী জানান, মাঝেমধ্যেই হযরত তৈয়ব আহম্মেদ চিশতী নামে জিনের বাদশা পরিচয় দিয়ে তাকে ফোন করা হতো। জিনের বাদশা তাকে বলতেন, বাবা তুই তো দুনিয়ার বাদশা, আখিরাতেরও বাদশা হয়ে গেছিস। তুই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মালিক হবি। এ ছাড়া তাকে দামি গাড়ি, বাড়ি ও আমেরিকা যাওয়ার প্রলোভনও দেওয়া হয়। জিনের মা সেজেও তাকে ফোন করে মোহগ্রস্ত করে রাখা হতো। জিনের বাদশার ভয় দেখিয়ে ও সম্মোহন করে ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত আসামিরা কয়েক দফায় মোট ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। একপর্যায়ে ব্যবসায়ীর অফিসের ভল্টে রাখা মা ও স্ত্রীর ব্যবহৃত ২০০ ভরি স্বর্ণালংকারও নিয়ে যায় তারা, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা। এরপর উত্তরখান এলাকায় তার মালিকানাধীন ২৭.১৫ কাঠা জমির (বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৪-১৬ কোটি টাকা) দলিলে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেয় আসামিরা।

 

ভুক্তভোগী দাবি করেন, তাকে সোহেল ফকিরের অফিসে ডেকে নিয়ে নেশাজাতীয় মিষ্টি খাওয়ানো হতো। দীর্ঘদিন তাকে এক ধরনের ঘোরের মধ্যে রাখা হয়েছিল। ওষুধের প্রভাব এবং জাদু-টোনার প্রভাবে তিনি তাদের সব কথাই শুনতেন। পরবর্তীতে তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেন। সবকিছু বুঝতে পেরে আত্মস্বজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানায় প্রতারণার অভিযোগ এনে ২৪ জনকে আসামি করে গত মাসে মামলা দায়ের করেন। আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন, মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির (৩৮), তার স্ত্রী শারমিন আক্তার একা (৩৫), দুই ভাই ভাই মো. সবুজ ও রুবেল এবং শাশুড়ি লাইলী শাহনাজ খুশি (একার মা) ওরফে মুন্নি, জনৈক নাজমুল হাসান ও এ আর রাসেল প্রমুখ।