Image description

ডা. আনিসুল গনি। বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার সদস্য। সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন সহযোগী অধ্যাপক। কিন্তু অফিসিয়াল কর্মের চেয়ে ব্যক্তিগত কাজকর্মেই ব্যস্ত থাকেন বেশি। প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নেই বললেই চলে তাঁর কাজকর্মে। আওয়ামী লীগ আমলে স্বাচিপের এবং বর্তমানে ড্যাবের ছত্রছায়ায় চলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের ডিউটি রোস্টারও মানেন না। ছুটি ছাড়াই চলে যান দেশের বাইরে। সরকারি আদেশ (জিও) বা অনুমোদন তার লাগে না। এমনকি সরকারি পাসপোর্টও ব্যবহার করেন না। এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কমিটিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলেছেন। কমিটির ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আনিসুল গনি খান গত বছরের তিন মাসে ২৬ দিন কোনো কারণ ছাড়াই অফিসে উপস্থিত ছিলেন না; নেননি কোনো ছুটিও। যেসব দিন উপস্থিত ছিলেন সেই দিনগুলোতে প্রবেশের সময় উল্লেখ থাকলেও তিনি কখন অফিস ত্যাগ করেছেন এর উল্লেখ নেই। আদতে অফিসে আসা-যাওয়ার নিয়ম তিনি তোয়াক্কা করেন না মোটেই। যখন ইচ্ছে, আসছেন-যাচ্ছেন। এছাড়া অনুপস্থিতির সময়ে তিনি বিদেশ ভ্রমণে ছিলেন। সেই কাজটিও করেছেন সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি হৃদরোগ হাসপাতালের অলিখিত নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছেন। মেডিকেল অফিসার থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত সবার দায়িত্ব বণ্টন, কক্ষ বণ্টন; এমনকি কে, কী কাজ করবে সেগুলোও নির্ধারণ করছেন তিনি। অথচ নিজেই এই রোস্টার মানেন না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদ আনিসুল গনি খান ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ২৬ দিন হাসপাতালে অনুপস্থিত ছিলেন। এই সময়ে তিনি ছুটি নেননি বা অসুস্থতারও কোনো রেকর্ড নেই কাগজপত্রে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, তিনি বিদেশ ভ্রমণে ছিলেন। বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করেছেন সরকারি এই চিকিৎসক। যার নম্বর- ‘এও-৪৭৪৩৬৫৯’।

ইমিগ্রেশন অফিসের তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, তিনি গত বছরের ২৮ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউরোপ ভ্রমণ করেন। ২৮ আগস্ট ঢাকা থেকে মাদ্রিদের উদ্দেশে যাত্রা করেন কিউআর৬৪১ ফ্লাইটে। ৪ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদ থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন ইকে৫৮২ ফ্লাইটে। এর আগে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর এসভি৮০৩ ফ্লাইটে মিশরের কায়রোর উদ্দেশে যাত্রা করেন। ২৬ অক্টোবর কায়রো থেকে এসভি৮০৮ ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন। একইভাবে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বিএস২১৭ ফ্লাইটে তিনি ব্যাংককের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ৫ অক্টোবর দেশে ফিরে আসেন বিএস২১৮ ফ্লাইটে। একই বছরের ২১ অক্টোবর ইউএল১৯০ ফ্লাইটে তিনি কলম্বোর উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং ২৬ অক্টোবর মালে থেকে বিএস৩৩৮ ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে আসেন। এই দিনগুলোতে অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ছুটি বা অনুমতি নেননি।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কর্মকর্তাদের হাজিরায় দেখা যায়, গত বছরের ২৮ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে দুদিন সরকারি ছুটি ছিল। ওই মাসের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। যদিও এই সময়ের মধ্যে তিন দিন সরকারি ছুটি ছিল। এ ছাড়া ডা. আনিসুল গনি খান সেপ্টেম্বরের ২০ ও ২১ তারিখে অনুপস্থিত ছিলেন। একই বছরের ২২ অক্টোবর থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি হাসপাতালে অনুপস্থিত ছিলেন। এ সময় একদিন সরকারি ছুটি ছিল।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এইচআরআইএস নথি সংরক্ষণ খাতায় দেখা গেছে, আনিসুল গনি খান ২০২৫ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর দুদিন অনুমোদিত ছুটি ভোগ করেন। বাকি অনুপস্থিতির কোনো কারণ বা ছুটি গ্রহণ করেছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে উল্লিখিত এই সময়ে বহিঃবাংলাদেশ ছুটির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০১৮ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার ২-এর খ উপধারায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের আচরণ সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিমালার কোনো বিধানের পরিপন্থি কোনো কার্য, অথবা কোনো সরকারি কর্মচারীর পক্ষে শিষ্টাচারবহির্ভূত কোনো আচরণ শাস্তিযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

সরকারি কর্মকর্তাদের পাসপোর্ট বিধি অনুযায়ী, পাসপোর্ট আবেদনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনাপত্তি সনদ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণে অফিসিয়াল পাসপোর্ট কিংবা ব্যক্তিগত ভ্রমণের জন্য সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি আদেশ (জিও) প্রয়োজন হবে।

অভিযোগের বিষয়ে ডা. মোহাম্মদ আনিসুল গনি খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ব্যক্তিগত বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না।’ পরে তিনি প্রতিবেদককে হাসপাতালে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন।

তদন্ত কমিটির ডাকে সাড়া দেননি

ডা. আনিসুল গনির অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে অভিযোগ উঠলে বিষয়টি নিয়ে গত ১১ এপ্রিল তদন্ত কমিটি করে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী। কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. তৌফিকুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটির সদস্য সচিব হলেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাজ্জাদুর রহমান এবং সদস্য হিসেবে আছেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুহা. মোস্তাফিজুর রহমান। কমিটিকে সার্বিক সহযোগিতা করতে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (একাডেমিক) মো. জাফর উল্ল্যাহকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কমিটি প্রয়োজনে নতুন সদস্য নিয়োগ দিতে পারবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও গত একমাসে রিপোর্ট দিতে পারেনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তদন্ত কমিটি দফায় দফায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানালেও অভিযুক্ত আনিসুল গণি পাত্তা দেননি।
এ নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. তৌফিকুর রহমান বলেন, ডা. আনিসুল গনিকে লিখিতভাবে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের জবাব দিতে বলা হলেও তিনি তা দেননি।

শীর্ষনিউজ