Image description

মাদকের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে পুরো দেশ। সরকারের জিরো টলারেন্স ও প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় মাদক এখন আরো বেশি বেপরোয়া।

দেশে মাদকের বিস্তার এখন আর শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি ধীরে ধীরে ভয়াবহ সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম- সর্বত্রই মাদকের ভয়াল থাবা ও রাজত্ব  ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের ওপর। বাড়ছে পারিবারিক কলহ, ভাঙছে সংসার, প্রিয়জনের হাতে প্রিয়জন খুনসহ ঘটছে নানা অপরাধ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে এটি জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, আইস ও ফেনসিডিলের মতো মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। উদ্বেগজনকভাবে তরুণদের একটি বড় অংশ দ্রুত মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অলিগলি, এমনকি কিছু অভিজাত এলাকাতেও মাদক ব্যবসার গোপন নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকের ভয়াবহ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে পারিবারিক জীবনে। একজন ব্যক্তি মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে প্রথমেই তার আচরণে পরিবর্তন আসে। পরিবারে অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট, মানসিক নির্যাতন ও সহিংসতা বাড়তে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে, সন্তানরা অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হচ্ছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে পারিবারিক কলহ থেকে ভয়াবহ বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও বেড়েছে। বিশেষ করে মাদকের অর্থ জোগাড় করতে না পেরে বা নেশায় বাধা পেয়ে এ ধরণের পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাগুলো ক্রমাগত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। মাদককে কেন্দ্র করে সংঘটিত বিভিন্ন পারিবারিক কলহ ও সহিংসতায় গত পাঁচ মাসে সারাদেশে অন্তত ৫০ জন মানুষ খুনের শিকার হয়েছে।

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় মাদকাসক্ত ফোরকান মোল্লা (৪০) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তার স্ত্রী, তিন মেয়ে এবং শ্যালককে জবাই করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গত ৯ মে (শনিবার) ভোরে উপজেলার রাউতকোনা গ্রামে হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান পালিয়ে যান এবং গত ১১ মে তিনি পদ্মা সেতু থেকে নদীতে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে পুলিশের ধারণা।
কুমিল্লার দেবিদ্বারে মাদকাসক্ত ছেলের বেধড়ক মারধরে মারা গেছেন বাবা। শনিবার (১৬ মে) পৌর এলাকার বড় আলমপুর গ্রামের এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার নিহতের অভিযুক্ত ছেলে পলাতক রয়েছে।
১৫ মে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে বাবা নিহতের ঘটনা ঘটেছে। নিহত আহমদ ডিলার (৭০) উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের পূর্ব অলিনগর বিশ্বটিলা এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ছেলে ইব্রাহীম হোসেন মিলনকে আটক করেছে পুলিশ।
১০ মে ফেনীর দাগনভূঞায় মাদকের টাকা না পেয়ে মাকে খুন, পিতা ও বোনকে ছুরিকাঘাত করেছে রাফি নামে এক মাদকাসক্ত যুবক।
২ মে চট্টগ্রামের বন্দর থানা এলাকায় জুয়া ও মাদকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে বেধড়ক মারধর করে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে স্বামী উজ্জ্বল চন্দ্র মিত্রের বিরুদ্ধে।
এরআগে ১৩ এপ্রিল ২০২৬, টাঙ্গাইলে নাজমা হরিজন নামের এক গৃহবধূকে মাদকের টাকা না পেয়ে শরীরে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ উঠেছে তার স্বামীর বিরুদ্ধে।
কুষ্টিয়ায় মাদকের টাকা না পেয়ে স্ত্রী শাহানারা খাতুনকে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে স্বামী আওয়ালের বিরুদ্ধে। এ সময় বাধা দিতে গেলে তিনি তার মাকেও জখম করেন।
বছরের শুরুতে চট্টগ্রামে মাদক কেনার টাকা না পেয়ে সন্তানদের সামনেই স্ত্রী লিজা আক্তারকে কুপিয়ে ও আঘাত করে হত্যা করে তার স্বামী।
বগুড়ার ধুনটে মাদকের টাকা না পেয়ে মা-বাবার ওপর নির্যাতন চালায় বিপ্লব শেখ (২৫) নামের এক যুবক। পরে ঐ যুবককে দুই মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। ফলে মাদক নির্মূলে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না; এটি ধ্বংস করে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত পুরো জাতির ভবিষ্যৎ। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পারিবারিক ভাঙন, সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি ও তরুণদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা। পরিবার থেকে সন্তানদের প্রতি যত্ন ও মানসিক সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণের একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই। সচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধ- এই তিনের সমন্বয়েই কেবল বাংলাদেশকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করা সম্ভব বলেও তারা মনে করেন।

মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজাউল করিম সোহাগ সংবাদমাধ্যম আরটিএনএন’কে বলেন, “বর্তমান সময়ে মাদক সবচেয়ে উদ্বেগ ও আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদককে কেন্দ্র করে মাইনর ক্রাইম থেকে শুরু করে সিভিয়ার ক্রাইম পর্যন্ত— প্রতিদিনই নানা ধরনের সহিংসতা ও হানাহানির ঘটনা ঘটছে।

প্রতিবছর বাংলাদেশে মাদককে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। দেশে আনুমানিক ৭০ থেকে ৭৫ লাখ মাদকাসক্ত রয়েছে। যেহেতু এটি একটি বিশাল অঙ্কের অর্থের ব্যবসা, তাই এর সঙ্গে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী জড়িয়ে পড়েছে এবং দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত মাদক নেটওয়ার্ক।

মাদকাসক্তরা সাধারণত অর্থ সংগ্রহের জন্য প্রথমেই নিজেদের পরিবারকে টার্গেট করে। মাদকের টাকা জোগাড়কে কেন্দ্র করেই শুরু হয় পারিবারিক কলহ ও অশান্তি, যার ভয়াবহ পরিণতিতে অনেক সময় প্রিয়জনের হাতেই প্রিয়জন খুনের শিকার হয়।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ সোহাগ আরও বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশে শত শত মানুষ মাদকের কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে আমাদের আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বাস্তবতা হলো, সরকার ও প্রশাসনের একক প্রচেষ্টায় এ সমস্যা পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এজন্য সম্মিলিতভাবে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সচেতনতামূলক ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যাতে এটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়।”

কেন সীমান্ত দিয়ে বিদেশি মাদক অসংখ্য চেকপোস্টকে ফাঁকি দিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবেশ করছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ আরটিএনএন’কে বলেন, সীমান্তে কঠোর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও ভৌগোলিক বাস্তবতা, চোরাকারবারিদের নিত্যনতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ও সীমিত জনবলের কারণে মাদক প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার অনেক এলাকাই দুর্গম ও অরক্ষিত। মাদক পাচারকারীরা দুর্গম চরাঞ্চল, ফসলের মাঠ এবং নদীপথকে রুট হিসেবে ব্যবহার করায় তাদের সহজে শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম নিয়ে এত বিশাল সীমান্ত এলাকায় কার্যকরভাবে কাজ করে সফল হওয়াটাও অত্যন্ত কঠিন বলে তিনি উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের সঙ্গে স্থানীয় অসাধু ব্যক্তিদের যোগসাজশ এবং সীমান্তজুড়ে সক্রিয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট থাকায় চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে মাদক প্রবেশ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরও বলেন, মাদকের সরবরাহ বন্ধে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নজরদারি আরও জোরদার করার পাশাপাশি মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে দেশের আটটি বিভাগে স্বতন্ত্র “মাদক আদালত” গঠন করা সময়ের দাবি।

জিরো টলারেন্স নীতি ও সরকারের নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও কেন মাদক সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না- এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার সংবাদমাধ্যম আরটিএনএন’কে বলেন, শুধু মাদক বহনকারী, সেবনকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনলেই মাদকমুক্ত সমাজ গঠন কিংবা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, এই অবৈধ ব্যবসার আড়ালে থাকা বড় বড় গডফাদার ও মাস্টারমাইন্ডদের সর্বপ্রথম চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। যদিও বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতিতে এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, কৌশলগতভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত গডফাদারদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার মাধ্যমে তাদের নিয়মিত আইনের মুখোমুখি করতে হবে।

তিনি মনে করেন, এ ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন অনেকাংশেই সরকার ও প্রশাসনের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

মাদকের ভয়াবহতা এবং তা নিয়ন্ত্রণে এলিট ফোর্সের চলমান পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে র‍্যাবের মিডিয়া ডিরেক্টর এমজেডএম ইন্তেখাব সংবাদমাধ্যম আরটিএনএন’কে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে র‍্যাব শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে।

তিনি জানান, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসা, পরিবহন ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য কারবারিকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। মাদকের বিস্তার রোধে র‍্যাবের এ ধরনের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা আরও কঠোরভাবে অব্যাহত থাকবে।