Image description

পুলিশ কর্মকর্তা ভাইকে পছন্দের জায়গায় বদলি করে দিতে একটি চক্রের সঙ্গে ১৫ কোটি টাকার চুক্তি করেন
অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারকের স্ত্রী। পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে কর্মরত তার ভাইকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ বা
রাজশাহীতে পোস্টিং করিয়ে দেওয়ার প্রলোভনে এ চুক্তি করেন তিনি। তবে আইনি ঝুঁকি এড়াতে চুক্তিতে
পোস্টিংয়ের বিষয়টি উল্লেখ না করে সেটিকে জমিসংক্রান্ত বিষয় হিসেবে দেখানো হয়।
এ ঘটনায় চক্রের সদস্য হিসেবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহাদাত হোসেন খান,
পুলিশ কনস্টেবল মো. জুয়েল ও মাসুম রানা নামের এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে মো. জুয়েল ঘটনার
সময় সচিবালয়ে কর্মরত থাকলেও পরে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

রাজধানীর সাগুফতা এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারকের স্ত্রীর আড়াই কাঠা জমি বেদখল হলে সেটি উদ্ধারে
তিনি কনস্টেবল জুয়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ জন্য প্রাথমিকভাবে জুয়েলকে আট লাখ টাকা দেওয়া হয়।
একক প্রচেষ্টায় জমি উদ্ধারে ব্যর্থহয়ে শাহাদাত হোসেন খান নামের এক ব্যক্তি কে নিয়ে আসেন জুয়েল। তাকেও
দেওয়া হয় আরও ২০ লাখ টাকা। জুয়েলের পরিচিত আরেক ব্যক্তি মাসুমকে দেওয়া হয় ১০ লাখ টাকা। জমি
উদ্ধারের নামে এভাবে মোট ৩৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
অবসরপ্রাপ্ত ওই বিচারকের স্ত্রী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তারা জমি উদ্ধারের কথা বলে আমার কাছ থেকে টাকা
নেয়। পরে জমি উদ্ধার করে দিতে না পেরে বলে আপনার স্বামী তো জজ। আপনার পরিবারে আরও সরকারি
কর্মকর্তা আছে। কেউ থাকলে বলেন, তাদেরকে ডিসি বা এসপি হিসেবে পো স্টিং করিয়ে দেই। পরে আমি ভাবি
আমার টাকাটা অন্তত উঠে আসুক। তখন ওরা আমার ভাইকে ভালো জায়গায় পোস্টিং করিয়ে দেওয়ার কথা বলে
আরও ২০ লাখ টাকা নেয়।’
যেভাবে তৈরি হয় ১৫ কোটির চুক্তিনামা 

জমি উদ্ধারে ব্যর্থ হওয়ার পর চক্রের সদস্যদের নতুন ফাঁদে পা দেনওই নারী। পরিবারের সদস্যদের পছন্দের জায়গায় পোস্টিংয়ের প্রস্তাব লুফে নেন তিনি। চক্রের সদস্যদের কাছে পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত তার ভাইয়ের কথা জানান। উত্তরে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রশাসনের উচ্চমহলে তদবিরের মাধ্যমে ওই নারীর
ভাইকে ভালো জায়গায় এসপি হিসেবে পোস্টিং করানো সম্ভব। এক্ষেত্রে বিশেষ করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ বা রাজশাহীতে পোস্টিং করানোর কথা বলা হয়।
এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে চার শর্তে১৫ কোটি টাকার চুক্তিনামা তৈরি হয়। শর্তেবলা হয়, চুক্তি সম্পাদনের ১৫ দিনের মধ্যে কাজ করে দিতে বাধ্য থাকবে উভয়পক্ষ। কাজ হলে চেকের মাধ্যমে পুরো অর্থপরিশোধ করা হবে। ব্যর্থ হলে চুক্তিপত্র ফেরত দিতে হবে।

CamScanner-19-03-2026-21

চুক্তিপত্রের একটি কপি এশিয়া পোস্টের হাতে এসেছে। এতে ব্র্যাক ব্যাংকের ছয়টি চেকের তথ্য রয়েছে। চেক
নম্বর ও অঙ্ক: সিএএস***৩৭ নম্বরে ৫ কোটি টাকা, সিএএস***৩৮ নম্বরে ৩ কোটি টাকা, এসবিসি***৪৮
নম্বরে ২ কোটি টাকা, এসবিসি***৪৯ নম্বরে ২ কোটি টাকা, এসবিসি***৪৬ নম্বরে দেড় কোটি টাকা এবং
এসবিসি***৪৭ নম্বরে দেড় কোটি টাকা।
ওই নারী বলেন, ‘আমি এত টাকা কোত্থেকে দেব? আমার তো এত টাকা নেই। তখন ওরা আমাকে বলে, ওরাই
ইনভেস্টর খুঁজে বের করবে। পোস্টিং করিয়ে দেবে, ইনভেস্টরের কাছ থেকে টাকা নেবে।’
ফোনে হুমকি
টাকা ফেরত চাইতে গেলেই শুরু হয় হুমকি। শাহাদাত হোসেন হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে ওই
নারীকে সতর্ককরেন। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আসসালামুআলাইকুম আপা। বিষয় হলো অন্য কারও
বুদ্ধিতে কারও প্ররোচনায় আপনি যদি বিভিন্ন মানে মিডিয়ার মাধ্যমে এটা নিয়ে এখনও দৌড়ঝাঁপ করেন তাহলে
কিন্তু আপনার ভাইয়ের ক্ষতি হবে, এটা মাথায় রাখবেন। এখানে আমাদের যে লাইনগুলো আছে সেটা হলো কিন্তু
সর্বোচ্চ চেইন। এখন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব (আমাদের লোক), মাথায় রাখতে হবে। আবার বলি আপনাকে, ঠিক
আছে? ওই ওখানের কনসার্নছাড়া কেউ ডিসি হয় না। ঠিক আছে? জনপ্রশাসন কিন্তু আমাদের নখদর্পণে। আপনি
যদি মনে করেন যে আমার ফাইলটা কোথায় আছে তাও কিন্তু দেখানো যাবে। এ রকম অবস্থা।’
এ প্রতিবেদকের হাতে আসা আরেকটি অডিওতে শাহাদাতকে বলতে শোনা যায়, ‘আপা আপনার ডিসিটা
(উপপুলিশ কমিশনার) আমরা কিন্তু গাজীপুর দিতে পারতাম। আমি কিন্তু জুয়েলকে আগেই বলেছি, গাজীপুরে
কিন্তু সেলিম সাহেব হবে না, অন্য লোক। আপনাকে তো দিয়েছি, মিলিয়ে দেখতে পারেন। ভুল লাইনে পরিচালিত
হচ্ছেন, এখনও সময় আছে। যদি আপনার ডিসিকে পদায়ন করতে চান তাহলে টাঙ্গাইল দেওয়া যাবে, টাঙ্গাইল
আর গাইবান্ধা। অন্য জেলায় আর হবে না।’
হোয়াটসঅ্যাপে ওই নারীকে পাঠানো টেক্সটে শাহাদাত বলেন, ‘আপা যতই এড়িয়ে চলবেন দেখা হবে। খুবই
ভালোভাবে দেখা হবে।’ পরে আরেক বার্তায় লেখেন, ‘আপনি লোকটার ডিসি হওয়া নষ্ট করলেন।’ আরেক বার্তায়
লেখেন, ‘গাজীপুরে পাঁচজন জমা দিয়েছে।

এর পাশাপাশি চক্রটি নিজেদের জিসান নামের এক শীর্ষসন্ত্রাসীর
লোক দাবি করে ওই নারীকে হুমকি দেয় এবং বাসায় মব করার ভয়
দেখায়। ওই নারী বলেন, ‘তারা আসলে প্রতারক। কোনো কাজই
করতে পারেনি। জমিটি এখনও উদ্ধার হয়নি। অন্য এক ব্যক্তি সেটি
ভাড়া দিয়ে রেখেছেন।’
দৃশ্যপটে শ্রমিক ফেডারেশন
হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ৭ মার্চঢাকা
মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক ফেডারেশনের কমিটি গঠিত হয়। ওই
কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন শাহাদাত হোসেন খান। কমিটি গঠনের পর শাহাদাত ওই ফেডারেশনের প্যাডের
ছবি বিচারকের স্ত্রীর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে অর্থদাবি করেন। এতে ওই নারী লেখেন, ‘আপনি রাজশাহী বা
ফরিদপুরে পোস্টিংয়ের ব্যবস্থা করেন পারলে। অন্য কোথাও হলে এমনিতেই হবে, তখন আপনার ক্রেডিট থাকবে
না। আমার ভাই এটা বলে দিয়েছে।’
অভিযুক্তদের বক্তব্য
শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা শাহাদাত হোসেন খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কোনো বিচারক বা তার স্ত্রীকে আমি
চিনি না। তাছাড়া আমি অনেক দিন ধরে কিডনির রোগী, চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত আছি।’
কনস্টেবল জুয়েলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার কাছে কিছুটাকা পাই, সে কয়েক মাস যাবৎ আমার
সঙ্গে যোগাযোগ করছে না।’
অভিযুক্ত কনস্টেবল মো. জুয়েল অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ
অস্বীকার করেন। শাহাদাতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও
তিনি আর রিসিভ করেননি।
মাসুম রানা এশিয়া পোস্টকে জানান, কনস্টেবল জুয়েলের মাধ্যমে ওই নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে দুজনের
মধ্যে ভাই-বোনের সম্পর্কগড়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘এক সময় আমার প্রয়োজনে তার কাছ থেকে চার লাখ টাকা
ঋণ নেই।’
টাকা ফেরতের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ফেরত দিতে চাই। কিন্তু তিনি আমার ফোন নম্বর ব্লক করে রেখেছেন।
তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না, তাই টাকাটা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না।