Image description

ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস আজ শনিবার (১৬ মে)। ঠিক ৫০ বছর আগে ১৯৭৬ সালের এই দিনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাবের প্রতিবাদে লাখো মানুষের এক অভূতপূর্ব লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জে।

জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত সেই ঐতিহাসিক জনসভায় দাঁড়িয়ে মওলানা ভাসানী এক হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ফারাক্কা ব্যারেজ চালু হলে বাংলাদেশের নদ-নদী, কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

পাঁচ দশক পর এসে মজলুম জননেতার সেই আশঙ্কাই আজ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক নির্মম ও বিধ্বংসী বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এক সময়ের প্রমত্তা ও খরস্রোতা পদ্মা আজ রুগ্ন স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।

যেখান থেকে আসে পদ্মার পানি

পদ্মা নদীর মূল উৎস হলো হিমালয় পর্বতমালার গঙ্গোত্রী হিমবাহের বরফ গলা পানি। ভারতের উত্তরাখণ্ড ও উত্তর প্রদেশের বিশাল পাহাড়ে সারা বছর ধরে যে বরফ গলে, তা-ই জলধারায় রূপ নিয়ে ভারতে ‘গঙ্গা’ এবং বাংলাদেশে ‘পদ্মা’ নামে প্রবাহিত হয়।

ভারতে এই নদী প্রায় ২৫টি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে দেশটির মোট পানির চাহিদার এক-চতুর্থাংশের বেশি জোগান দেয়। আলকানন্দা, রামগঙ্গা, কালীনদী, যমুনা, গোমতী, কালী গণ্ডক, কোশী এবং সোন নদীর মতো প্রায় ২৫টি শক্তিশালী উপনদীর পানিপ্রবাহ নিয়ে গঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করার পর বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পদ্মার দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫৭ কিলোমিটার। এটি রাজশাহী, পাবনা, ঢাকা এবং ফরিদপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় যমুনা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে, যা তিস্তাসহ আরও ১০টি নদীর পানি বয়ে আনে।

এই বিশাল জলরাশি পরিবহন করে পদ্মা যখন চাঁদপুরের মেঘনা মোহনার দিকে ছুটে যায়, তখন পানির গতি ও তীব্রতা বিশ্বে একমাত্র আমাজন নদীর পরেই অবস্থান করে। মাওয়া অঞ্চলে পদ্মা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪০ হাজার কিউবিক মিটার পানি পরিবহন করে এবং প্রতি বছর প্রায় ১ থেকে ২ বিলিয়ন টন পলি বা মাটি অপসারণ করে দেশের অর্থনীতি, কৃষি ও ভূগোলে অত্যাবশ্যকীয় ভূমিকা রাখে। অথচ এই বিশালাকার জীবনরেখাই আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে পানি প্রবাহ
ভারত ও নেপালের এই বিশাল সম্মিলিত জলরাশি বুকে নিয়ে পদ্মা বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও তা আজ ফারাক্কা বাঁধের মরণকামড়ে ধুঁকছে। বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের গবেষকদের ‘স্প্রিঙ্গার ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে ১৯৭৪ সালে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানিপ্রবাহ ছিল প্রতি সেকেন্ডে ৩ হাজার ৬৮৫ ঘনমিটার। কিন্তু ৫০ বছর পর ২০২৪ সালের শুষ্ক মৌসুমে সেই প্রবাহ নেমে এসেছে মাত্র ১ হাজার ৭৬ ঘনমিটারে। অর্থাৎ, গত পাঁচ দশকে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পদ্মার মোট জলপ্রবাহ কমেছে ২ হাজার ৬০৯ ঘনমিটার, যা গড়ে প্রায় ৭১ শতাংশ। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এই নদীতে মাত্র ২৯ শতাংশ পানি অবশিষ্ট রয়েছে, যা এই অঞ্চলের পরিবেশের ওপর মারাত্মক আঘাত হানছে।


পানি সংকটে ৩ নদী
পদ্মা নদীর পানির স্তর এভাবে আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় এর সাথে সংযুক্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের অন্য তিনটি আন্তঃসীমান্ত নদী পানি সংকটে। নদীগুলো হলো মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তফিজুর রহমানের গবেষণা অনুযায়ী, প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর তলদেশে দ্রুত পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে, যা তীব্র নাব্যতা সংকট তৈরি করছে। এর ফলে এক চরম বিপরীতমুখী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং মরুকরণের লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে তলদেশ ভরাট হওয়ায় বর্ষাকালে ভারত যখন হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়, তখন নদীগুলো সেই পানি ধারণ করতে পারে না। এর ফলে দেখা দেয় তীব্র নদীভাঙন, আকস্মিক বন্যা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।

অধ্যাপক মোস্তফিজুর রহমান বলেন, ‘যদি দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি বিধ্বংসী পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। পদ্মাকে বাঁচাতে হলে জলবণ্টন চুক্তি দ্রুত ও কার্যকরভাবে নবায়নের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পানি সংরক্ষণ ও নদী ড্রেজিং ব্যবস্থা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।’

জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব
শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের গাইপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুর রহিম ও জাব্বার, যারা ১৯৭৬ সালের সেই লংমার্চের জনসভায় উপস্থিত ছিলেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভাসানী সাহেব তখনই বলেছিলেন ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনবে, আজ আমরা বুড়ো বয়সে এসে নিজের চোখে সেই কথার বাস্তব রূপ দেখছি। আগের মতো পদ্মা তো নেই। কষ্ট করে হেঁটেই চরে যেতে হয়। নৌকার মাঝিরাও এখন পেশা বদলাচ্ছে।’

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর ভাষ্য মতে, ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৮ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তার নির্ধারিত পানির ন্যায্য ভাগ থেকে বঞ্চিত। শুষ্ক মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মার বুকে এখন শুধুই ধু-ধু বালুচর। নৌ-চলাচলের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হওয়ায় চর অঞ্চলের মানুষকে মাইলের পর মাইল তপ্ত বালুতে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে এবং মালামাল পরিবহনে চরের একমাত্র ভরসা এখন গরুর গাড়ি।

মাছের ঘাটতি
এক সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মাছের জন্য বেশ সুপরিচিত ছিল। এ জেলার উৎপাদিত মাছ স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য জেলায় সরবরাহ করা হতো। কিন্তু ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাবে পদ্মাসহ স্থানীয় নদী ও খালবিলগুলোয় ব্যাপক পানি সংকট রয়েছে। ফলে জেলায় মাছের উৎপাদনে টান পড়ে ঘটতি হচ্ছে।

স্থানীয় মৎস্য অফিসের পরীসংখ্যান অনুযায়ী, এই জেলায় চাহিদার তুলনায় এখন অন্তত দেড়শ টন মাছের ঘাটতি রয়েছে।

মৎস্যজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ এবং পানির স্তরের সঙ্গে মাছের মজুতও ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অনেকেই এখন মাছ না পেয়ে ঐতিহ্যবাহী পেশা ত্যাগ করে নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন। নিবন্ধিত প্রায় আড়াই হাজার জেলে এখন বছরের অনেকটা সময় অলস সময় পার করছেন।

উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের প্রধান উদ্বেগ এখন চলতি ২০২৬ সাল ঘিরে, কারণ ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরেই শেষ হতে যাচ্ছে। পরিবেশবিদ ও নদী গবেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও উজানের পানি প্রত্যাহারের প্রেক্ষাপটে যদি আন্তর্জাতিক পানি-বণ্টন চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে কার্যকরভাবে নবায়ন ও বাস্তবায়ন না করা হয়, তবে আগামীতে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বিশাল অংশ স্থায়ী মরুকরণের দিকে ধাবিত হবে।

যা বলছে পাউবো
নদীগুলোর এই সংকটের কথা স্বীকার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবীব জানান, ফারাক্কা ব্যারেজের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণেই পদ্মাসহ অন্য তিন নদী শুকিয়ে যাচ্ছে এবং নাব্যতা সংকটের কারণে শুষ্ক মৌসুমের পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না, তবে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষ করে পাগলা নদী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিবগঞ্জ উপজেলার শাহাবাজপুর ইউনিয়নের শেষ সীমানা হতে সদর উপজেলার কালিনগর ফাটাপাড়া পর্যন্ত পাগলা নদীকে জীবন্ত রাখা সবার নৈতিক দায়িত্ব। নদীর সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্ত করতে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে ২০১৯ সালে অভিযান চালিয়ে নদীর জমি কিছুটা দখলমুক্ত হয়েছে। নদী খনন করা হয়েছে ২০২১ সালে। বর্তমানে নদীটি আর মৃত্যু নয়। পদ্মা নদীর সঙ্গে সংযোগের বিষয়টি বিবেচনাধীন। কারণ এখানে নদী ভাঙন ঠেকাতে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পাগলা নদীতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারলে জন্ম নেবে শৈবাল বা দল। ফিরে আসবে পুরাতন ঐতিহ্য। নদীতে বাঁধ, সেতু বা খাল ভরাটের কারণে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিলুপ্তি হয়েছে শৈবাল বা জলজউদ্ভিদ। পাগলা নদীর বিষয়ে পরিকল্পনা প্রস্তুতে একটি কমিটি করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস ও এই বাঁধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে আজ চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভুক্তভোগী মানুষ, কৃষক ও পরিবেশবিদদের একটাই আহ্বান কাগজে-কলমে পরিকল্পনার চেয়ে মাঠপর্যায়ে দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি, কারণ নদী বাঁচলেই কেবল বাঁচবে এদেশের কৃষি, পরিবেশ এবং এই অঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন।