সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে গো-খামারিদের বাড়ি বাড়ি রক্তমাখা চিঠি দিয়ে হত্যা ও ডাকাতির হুমকি দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। চিঠিতে খামারিদের ঘরের দরজা খোলা রাখতে বলা হয়েছে।
শুক্রবার (১৫ মে) রাতে এ বিষয়ে স্থানীয় খামারি মো. আমজাদ হোসেন বাদি হয়ে শাহজাদপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন। এর আগে গত ৫ দিনে উপজেলার গাড়াদহ ইউনিয়নের টেকুয়াপাড়া গ্রামের প্রায় ১৫টি বাড়িতে এমন চিঠি দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
টেকুয়াপাড়া গ্রামের গোখামারি হাজি রফিকুল ইসলাম, শাহাদৎ হোসেন, আজাদুল ইসলাম, সানোয়ার হোসেন বলেন, গত ৪/৫ দিনে অন্তত ১৫ জনের বাড়িতে দুর্বৃত্তরা নিজেদের রঘু ডাকাত পরিচয় দিয়ে রক্তমাখা চিঠি পাঠিয়েছে।
চিঠিতে লিখেছে ‘কালকে আপনাদের বাড়িতে ডাকাতি করতে আসবো, তাই দরজা খোলা রাখবেন, না খুলে রাখলে জিন্দা খালাস...? ইতি রঘু ডাকাত’।
এদিকে একই গ্রামের আবু সাঈদ নামে এক কৃষকের বাড়ির গরু লুট করতে ব্যর্থ হয়ে তার মেয়ে বিথি খাতুনকে রক্তমাখা চিঠিতে হত্যার হুমকি দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
ওই চিঠিতে লেখা, ‘আপনার মেয়ের জন্য আজকে বেঁচে গেলেন, ভাইবেন না আবার বাঁচবেন। এই বছরের প্রথমবারের মিছ হলো ওই ম্যাডামের জন্য, দেখে লেবো, মেয়ে মানুষের এত সাহস ভালো না। কালকে রাতে বাঁচতে চাইলে দরজা খোলা রাখবেন। না রাখলে জিন্দা লাস বানিয়ে দিবো। ইতি রঘু ডাকাত। কোড নম্বর ০৬। এভাবে প্রতিটি চিঠিতে কোড নম্বর দেওয়া আছে।
অপরদিকে চেতনানাশক স্প্রের মাধ্যমে বাড়ির সবাইকে অচেতন করে খামারি আবু হোসেনের বাড়ি থেকে একটি ষাঁড় ও আমজাদ হোসেনের বাড়ির শোকেজের লকার ভেঙ্গে নগদ টাকা ও গহনা লুট করেছে।
আমজাদ হোসেন বলেন, মঙ্গলবার মাগরিবের নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বাড়ি ফিরে দেখেন তার স্ত্রী সারা খাতুন অচেতন হয়ে মেঝেতে পড়ে আছেন। ঘরে ঢুকতেই তার নাকেও স্প্রের গন্ধ আসে এবং তিনিও অচেতন হয়ে পড়েন। গভীর রাতে জেগে উঠে দেখেন শোকেজের লকার ভেঙ্গে ১ লাখ টাকা, ১২ ভরি স্বর্ণ ও ৫ ভরি রূপার গহনাসহ প্রায় ৩০ লাখ টাকার জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে।
অপর ভুক্তভোগী আবু হোসেন বলেন, ১৫ দিন আগে জানালা দিয়ে চেতনানাশক স্প্রে করে বাড়ি থেকে ২ লাখ টাকা দামের একটি ষাঁড় চুরি করে নিয়ে গেছে।
এসব ঘটনার পর ডাকাতি ও চুরি আতংকে রাত কাটাচ্ছে টেকুয়াপাড়া গ্রামবাসী। চিঠি দিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়ায় শিশুদেরকে একা একা স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছে অভিভাবকরা। সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের রাস্তাঘাট ও বাজার জনশূন্য হয়ে পড়ে। গ্রামের যুবকরা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে। তারপরও চুরি-ডাকাতি ঠেকাতে পারছে না। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন গ্রামবাসী বলেন, বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে এ গ্রামের ক্লাবঘরে এক জরুরি বৈঠক চলা অবস্থায় দূর্বৃত্তরা আবু সাঈদের বাড়ি থেকে ২টি গরু লুট করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় আবু সাঈদের মেয়ে প্রাইভেট শিক্ষক বিথি খাতুন টের পেয়ে ডাক, চিৎকার শুরু করে। এসময় বৈঠকের লোকজন দৌড়ে ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে দুর্বৃত্তরা গরু ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর ওই রাতেই বিথি খাতুনকে উদ্দেশ্য করে ঘরের মধ্যে একটি রক্তমাখা চিঠি ফেলে রেখে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে চিঠিটি হাতে পেয়ে বাড়ির লোকজন আতংকিত হয়ে পড়েন।
টেকুয়াপাড়া মিলন সংঘের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, দুর্বৃত্তরা গত ৪দিনে আলতাব হোসেন, ঈমান আলী, বাবর আলী মেম্বর, আব্দুল হামিদ, আব্দুল খালেক ফকির, বাবলু ফকির, শাহীন ফকির, ইসমাইল ফকির, জলিল মন্ডল, শাহ আলমসহ অন্তত ১৫ জনের বাড়িতে এ ধরণের চিঠি পাঠিয়েছে। এ চিঠি পাওয়ার পর থেকে আমাদের ক্লাবের সদস্যরা রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিচ্ছে। তার পরেও চুরি ও চিঠি পাঠানো ঠেকানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, আমাদের গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এক বা একাধিক কোরবানির ষাঁড় গরু লালন পালন করা হচ্ছে। এই সময় এ চোরের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় সবাই আতংকের মধ্যে রয়েছে। চোর-ডাকাতের ভয়ে সন্ধ্যার পরে বাজার ও রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে গ্রামজুড়ে এক ভয়ংকর আতংক রিরাজ করছে।
শাহজাদপুর থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, চিঠি দেওয়ার বিষয়টি জানার পরই আমরা তদন্ত শুরু করেছি। ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। একটি চুরির বিষয়ে আমজাদ হোসেন বাদি হয়ে অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে।
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিন বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাটি জানার পর এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে শাহজাদপুর থানার ওসিকে বলা হয়েছে।