Image description

রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী বোগদাদীর মাজারে ওরশ চলাকালে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে একদল লোক।

বৃহস্পতিবার রাতে ওই হামলার শিকার জিয়ারতকারী কয়েকজন বলছেন, হামলাকারীরা 'জামায়াত শিবিরের' লোক।

তবে ওই এলাকায় জামায়াত থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) দাবি করেছেন, সেখানে তার দলের কোনো লোক ছিল না, যা ঘটেছে তা ‘পুলিশের মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ অংশ।

বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারাও ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তবে চব্বিশের ৫ অগাস্টের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাজার ও সুফি দরগায় হামলা ও ভাঙচুরের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার রাতের ওই হামলা হল কিনা, তা নিয়ে আতঙ্কিত ওই মাজারের অনুসারীরা।

তারা বলছেন, আগের সপ্তাহেও যুবদলের লোকেরা মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সেখানে হামলা চালিয়েছিল।

বৃহস্পতিবার রাতে মাজার জিয়ারত করতে আসা লোকজন বলছেন, হামলাকারীরা মাজারের ভেতর পর্যন্ত গিয়ে লোকজনকে মারধর করেছে।

আব্দুস সবুর নামে একজন বেসরকারি চাকুরে বলেন, প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে মাজারে একটি সাপ্তাহিক ওরশ হয়। সেখানে ঢাকা এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে লোকজন আসে।

বৃহস্পতিবার রাতে সেই ওরশ চলাকালে হঠাৎ লাঠিসোঁটা হাতে কিছু লোক এসে জিয়ারতকারীদের মারধর শুরু করে।

 

 

পিটুনিতে আহত এক ব্যক্তি বলেন, “কিছু লোক আসছে লাঠি নিয়া… একটা বিদিকিচ্ছিরি তৈয়ার কইরা দিছে। অনেক লোক দৌড়াদৌড়ি করছে, আমি মেইন গেইটে বাইরইবার গেছি, আমাকে মাথাত বাড়ি দিছে।”

হাতের মোবাইল ফোনে ঘটনার কিছু ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, “এই লোকগুলি নেতৃত্ব দিছে, এই যে দেখেন একটা ছেলে।… ওরা নেতৃত্ব দিছে।”

পুলিশ সাদা পোশাকে এখানে অভিযান চালিয়েছে কি না প্রশ্ন করলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন সমস্বরে ‘না’ ‘না’ বলে ওঠেন।

তাদের একজন বলেন, ওই সময় মাজারের গেইটের বাইরে পুলিশের চারটি গাড়ি থাকলেও তারা ভেতরে ঢোকেনি।

“এরা নিশ্চই একটা পরিকল্পনা কইরা তারপরে আসছে। নাইলে পুলিশ কেন ভেতরে ঢুকল না?”

তাহলে কারা হামলা চালিয়েছে জানতে চাইলে পাশ থেকে একজন বলেন, “সব জামায়াতের লোক।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মিরপুর বিভাগের বিভাগের উপ কমিশনার মো. মোস্তাক সরকার বলেন, "মাজার এলাকায় পুলিশ মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গেলে সেখানে কিছু উৎসুক মানুষ নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে। পরে পুলিশ সেখান থেকে ফিরে আসে।"

 

 

তবে হামলার সময়ের যেসব ভিডিও ফেইসবুকে এসেছে, সেখানে অর্ধশতাধিক লোককে লাঠি হাতে মারধর করতে দেখা গেলেও কোনো পুলিশ দেখা যায়নি।

কোনো অভিযান চালানোর কথা অস্বীকার করে দারুস সালাম জোনের সহকারী কমিশনার ইমদাদ হোসেন বিপুল বলেন, "মাজারে তো আমরা অভিযান চালাইনি। রাতে যেটা দেখলাম যে জামায়াত-শিবিরের পোলাপান মনে হয় ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিযান চালিয়েছে। গত সপ্তাহে বিএনপি থেকে মিরাজ যেমন নিজ উদ্যেগে অভিযান চালিয়েছিল কালকে মনে হয় জামায়াত শিবির নিজ উদ্যোগে অভিযান চালিয়েছে। এখানে পুলিশের কোনো ইনভল্ভমেন্ট নেই। "

পুলিশ সেখানে গিয়েছিল কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "না না না, একটা পলিটিক্যাল পার্টির সাথে আমরা কীভাবে অভিযান করব!"

তবে অভিযানে এডিসি, ওসিসহ অন্য কয়েকজন কর্মকর্তা গিয়েছিলেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তথ্য দিয়েছেন পুলিশের মিরপুর বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে সহকারী কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, "না না, কেউ অভিযানে যায়নি। কে বলেছে আপনাকে?"

 

 

পরে তাকে জানানো হয় মিরপুর বিভাগের উপ- কমিশনারও এমন বক্তব্য দিয়েছেন। এরপর সরকারি কমিশনার বিপুল বলেন, "অভিযান করেছে তারাই (জামাত-শিবির), আমরা ভেতরে ঢুকিনি।"

তাহলে পুলিশ বাইরে ছিল কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, "বাইরেও থাকিনি আমরা। আমরা দেখছি যে একটি ঝামেলা... আপনাকে ক্লিয়ারকাট বলি, কোনো পলিটিক্যাল পার্টির সাথে এনগেজ হয়ে অভিযান করার মত সুযোগ নেই আমাদের। যখন আমরা আঁচ করতে পেরেছি যে এরকম একটা অভিযান উনারা (জামায়াত- শিবির) করবে, তখন আমরা আজকে কোনো অভিযান করব না বলে সিদ্ধান্ত নিই। তখন আমরা আমাদের মত ব্যাক আর কি।"

তবে শাহ আলী থানার ওসি বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, "ঘটনা হচ্ছে রওজার পূর্ব পাশে যেখানে শুক্রবারে নামাজ পড়ে, সেই জায়গায় বাইরে থেকে আসা কিছু মহিলা ও পুরুষ মাদুর বিছিয়ে গাঁজা সেবন করতে বসেছিল। তখন মাজারের জিয়ারতকারীরাই তাদের সেখান থেকে সরিয়ে মাজার প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেয়।"

ওসি বলেন, "এটুকু ঘটনাই আমরা পাইছি। আমি গেছিলাম, আমার অফিসার গেছিল। শুক্রবারে জুম্মার নামাজ যে জায়গাটায় হয় সেখানে বসে কেউ গাঁজা খায় না। কিন্তু গতরাতে সেখানেও গাঁজা খাওয়ার আসর বসানো হয়েছিল। সে কারণে জিয়ারতিরাই তাদের সরিয়ে দেয়। পুলিশের এখানে কোনো রোল নেই।"

মিরপুর এলাকার সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত ব্যারিস্টার আরমান ঘটনার সঙ্গে তার দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

যোগাযোগ করা হলে শুক্রবার সকালে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সেখানে যা ঘটেছে সেটা ‘পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের ফলাফল’।

তিনি বলেন, "পুলিশ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে সেখানে প্রতিদিন রাতে গাঁজার আসর বসে, বৃহস্পতিবার রাতে অনেক মাদকসেবীর আড্ডা হয়। এখানে একটা বড় অভিযান চালানো হবে। এতটুকুই আমাকে জানানো হয়েছিল।"

সেই অভিযানে জামায়াতের লোকজন বা স্থানীয় লোকজনের অংশগ্রহণ ছিল কিনা প্রশ্ন করা হলে এই সংসদ সদস্য বলেন, "না। ব্যাপারটা হচ্ছে একটা ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এরকম অবৈধ অশ্লীল কাজে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত।

“আমার নির্বাচশি ইশতেহারের সবচেয়ে বড় ওয়াদা ছিল মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। সেজন্য আমরা পুলিশকে বারবার বলেছি, পুলিশ ও বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় রয়েছে। এখানে বৃহস্পতিবারে যা ঘটেছে তা প্রাইমারিলি মাদককেন্দ্রিক অ্যাক্টিভিটিজ। বৃহস্পতিবার রাতে এখানে সবচেয়ে বেশি মাদক বেচা বিক্রি হয় এবং প্রকাশ্যে হয়, সেজন্য পুলিশ অ্যাকশন নিয়েছে।"

জামায়াতের স্থানীয় কোনো লোকজন সেখানে ছিল কিনা–আবারো প্রশ্ন করা হলে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, "আমার কোনো লোকজন সেখানে ছিল না। আমাকে কয়েকজন সাংবাদিক ভিডিও পাঠিয়েছেন, আমি সেগুলো দেখেছি। সেখানে আমার পরিচিত বা দলের কোনো লোক আমি দেখিনি সেখানে।"

২০২৪ সালের ৫ অগাস্টে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর সারা দেশে মাজার-খানকায় হামলা শুরু হয়।

ওই সময় থেকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ৯৭টি মাজারে হামলার তথ্য দিয়েছে সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’।