Image description
 

Naem Nizam (নঈম নিজাম)

 
 
রাজনীতিতে সর্বোচ্চ নেতারও অনেক সময় সঠিক পরামর্শের প্রয়োজন হয়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের সংসদ যেমন প্রাণবন্ত ছিল, তেমনি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানও ছিল। দুই নেত্রীর রাজনৈতিক বিরোধ যেমন ছিল, তেমনি সংসদে অনেক বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐকমত্যও দেখা যেত। এরশাদকে গুলশানের সাব জেল থেকে কারাগারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত সংসদে বিতর্কের ভিতরে হয়েছিলো।
 
একবার দুই নেত্রীর মাঝে একটি কঠিন ভুলবোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। বিষয়টি ছিল সাঈদ ইস্কান্দারের দুই সন্তানের ওপর ধানমন্ডিতে হামলার ঘটনাকে ঘিরে। সাঈদ ইস্কান্দার শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভাই নন, তিনি এমপি ছিলেন। তার দুই ছেলে ধানমন্ডির একটি স্কুলে পড়তো।তারা যেত ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের সামনে দিয়ে। ৩২ নাম্বারের সামনে দিয়ে তারা হেঁটে গিয়ে গাড়িতে চড়তো ।
 
রাজনৈতিক অনুষ্ঠান থাকলে সড়কটি বন্ধ থাকতো। তখন গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে হতো। তেমনই একদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। তখন কোন অনুষ্ঠান ছিলো না। তবে সড়ক বন্ধ ছিলো। সাঈদ ইস্কান্দরের সন্তানরা নেমে পড়ে । তারা সড়ক বন্ধের জন্য বকা দেয়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে কটুক্তি করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই জন বেরিয়ে এসে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। কার সন্তান, তা না জেনেই দুই কিশোরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে।
 
কাঁদতে কাঁদতে দুই কিশোর গিয়ে তাদের ফুফু প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে বিচার দেয়। পুরো ঘটনা খুলে বলে। প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। কষ্ট পান । তিনি আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। একটা অস্বস্তি তৈরি হয়।
 
ঘটনার দিন শেখ হাসিনা রংপুরে ছিলেন। তখন তিনি ঢাকায় ২৯ মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবন ও ধানমন্ডির সুধা সদনে থাকতেন। রংপুরে খবর পেয়ে শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ হন সংশ্লিষ্টদের উপর। ঢাকায় ফিরে তিনি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। তাদের চাকরিচ্যুত করেন।
 
পরের দিন শেখ হাসিনা সংসদে নিজের কক্ষে অবস্থানকালে বিরোধী দলের উপনেতা আব্দুস সামাদ আজাদ ও আবুল হাসান চৌধুরী এমপি তার কক্ষে প্রবেশ করেন। তারা বিষয়টি তোলেন। কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। একটু পর যোগ দেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী মৃণাল কান্তি দাস । আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, শেখ হাসিনা নিজেই সাঈদ ইস্কান্দারের বাসায় যাবেন।
শেখ হাসিনা ফোন করেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামকে। তিনিও যোগ দেন। মৃণাল সঙ্গে নেন ক্যামেরাম্যান স্বপন সরকারকে। সবাইকে নিয়ে শেখ হাসিনা যান সাঈদ ইস্কান্দারের বাসায়। মাহফুজ আনাম ওঠেন শেখ হাসিনার গাড়িতে।
 
দরজা খুলে দিলে শেখ হাসিনা সবাইকে নিয়ে সামনের অতিথিকক্ষে বসেন। সে সময় মিসেস ইস্কান্দার শাওয়ারে ছিলেন। সাঈদ ইস্কান্দার তখন বাসায় ছিলেন না। দুই ছেলে সামনে আসতেই শেখ হাসিনা তাদের জড়িয়ে ধরেন। চকলেট দেন। কোলে তুলে নিয়ে গল্প শুরু করেন।
 
মাহফুজ আনামের পরামর্শে মৃণাল একটি ছোট টেপ রেকর্ডার চালু করে দেন, যাতে শুরু থেকে পুরো কথোপকথন রেকর্ডে রাখা যায়। স্বপন সরকার ক্যামরা দিয়ে ছবি তোলেন।
শেখ হাসিনা দুই কিশোরকে বলেন, ‘তোমাদের সঙ্গে যা হয়েছে, তাতে আমার খুব খারাপ লেগেছে। আমি সবাইকে বকেছি। যারা এমন করেছে, তাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। তোমরা ৩২ এর এই বাড়িতে যখন খুশি যাবে । আমি থাকব। তোমাদের দেখাব।
 
এরপর মিসেস ইস্কান্দার অতিথিকক্ষের সামনে এসে থমকে দাঁড়ান। তিনি কড়া প্রতিবাদ জানান এবং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কী করে এটা হলো? কেমন করে হলো? ওরা কি মানুষ? আপনি এখানে এসে কি হবে?
 
শেখ হাসিনা দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আপনার আবেগের সঙ্গে একমত। পুরো ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। আমি ঢাকায় ছিলাম না। তাই ফিরেই আপনার কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে ছুটে এসেছি। আমি নিজেও একজন মা। এই বাচ্চাদের ট্রমা দূর করা দরকার।তাই আমার আসা।
 
কথা শেষ হলো।.মাহফুজ আনাম, আবদুস সামাদ আজাদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবুল হাসান চৌধুরী ও মৃণাল কান্তি দাসসহ সবাইকে নিয়ে ফিরে আসেন।
রাতে সেই খবরটি প্রকাশ করেছিলাম। তারপর এনিয়ে কোনো পক্ষই বাড়াবাড়ির পথে যায়নি কেউ।