নেত্রকোনার ধলাই নদীতে সেতুর অভাবে চরম দুর্ভোগে প্রায় ২০ গ্রামের হাজার-হাজার মানুষ। স্বাধীনতার পর থেকে একের পর এক জনপ্রতিনিধি সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে নির্মাণ হয়নি কাঙ্ক্ষিত সেই সেতু। ফলে প্রতিদিন নদী পারাপারে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও কর্মজীবী মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে আরও বেড়ে যায় দুর্ভোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচন এলেই সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি মিললেও ভোট শেষে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও একটি স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় হতাশ নদীর দুই পাড়ের মানুষ। তাদের একটাই দাবি— দ্রুত ধলাই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান করা হোক।
মোহনগঞ্জের পাথরকাটা গ্রাম ও সহিলদেও মেদিপাথরকাটা গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ধলাই নদী। সমাজ সহিলদেও ইউনিয়নের এ দুই গ্রাম ছাড়াও অন্যান্য গ্রামগুলোকে যুক্ত করেছে একটি রশি।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি ড্রাম একত্র করে কাঠের তক্তা বিছিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে টাঙানো দড়ি ধরে টেনে টেনে নদীর এপার থেকে ওপারে যাচ্ছেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। কেনাকাটা, চিকিৎসা ও দাপ্তরিক কাজসহ নানা প্রয়োজনে ২০ গ্রামের মানুষকে যেতে হয় মোহনগঞ্জ। তাছাড়া খান বাহাদুর কবির উদ্দিন খান উচ্চ বিদ্যালয়, ২৯ নং সহিলদেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, খান বাহাদুর কবির উদ্দিন খান বাজারসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, ব্যাংক ও হাসপতালে যেতে হলে এলাকাবাসীকে ধলাই নদী পার হতে হয়। বর্ষায় নদী ভরে গেলে পারাপারে জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েক গুন। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে যে পানি থাকে তাতে ঠিকমতো ড্রামের বোট চালানো যায় না। ফলে শেষ নেই দুর্ভোগের।
স্থানীয়রা জানান, সহিলদেও ও মেদিপাথরকাটা গ্রাম থেকে মোহনগঞ্জ শহরের দূরত্ব প্রায় ১১ কিলোমিটার। আজিমপুর, জবাখালি, সাকরাজ, উত্তিয়ারকোণা, নয়াপাড়া, কেওয়ারদীঘি, চিরামপুর, রামজীবনপুর, পাইলাটি, জয়পুর, মিয়াশি, কয়রাপাড়া, হাছলা, শেখুপুর, পালগাঁও, রানাহিজল ও গারাউন্দসহ আশপাশের অন্তত ২০ গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এ রাস্তা ব্যবহার করেন। বর্ষাকালে প্লাস্টিকের ড্রামের তৈরি বোটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী নদী পার হয়ে স্কুল-কলেজে যাতায়াত করে। বর্ষা মৌসুমে ড্রামের বোটে পারাপার করতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয় তারা।
স্থানীয়রা আরও জানান, সেতু নির্মাণের দাবিতে বহুবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
উতিয়ারকোণা গ্রামের মো. পারভেজ খান, মেদিপাথরকাটা গ্রামের আব্দুল মালেক খান ও হালিম খান, পাথরকাটা গ্রামের মো. জাহান খান ও মো. হলুদ খান উল্লেখ করেন, ধলাই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ হলে নদীর দুই পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসবে। কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং উন্নয়ন ঘটবে যোগাযোগ ব্যবস্থায়।
খান বাহাদুর কবির উদ্দিন খান উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তার, নবম শ্রেণির নাভা আক্তার ও মিনার আক্তার জানান, শুষ্ক মৌসুমে কোনোমতে যাতায়াত করা গেলেও বর্ষায় চরম ভোগান্তি হয়।
পাথরকাটা গ্রামের সাদেক মিয়া, আলম মিয়া, সত্তার, সেলিম, খোকন ও রঞ্জু মিয়া বলেছেন, নদীতে সেতু না থাকায় মালামাল নিয়ে যাতায়াত করা যায় না। পণ্য পরিবহনের জন্য ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার ঘুরতে হয়।
কৃষক হাবিব মিয়া আক্ষেপ করে বললেন, ‘অনেক দিন আগে একবার ইঞ্জিনিয়ার অফিসের লোকজন আইসা মাপ নিয়ে গেছিলো। তা আর কত দিন মাপলে এই সেতুটি হবে আল্লাহ জানে।’
খান বাহাদুর কবির উদ্দিন খান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মৌলার ভাষ্য, ‘সেতুটি নির্মাণ করা হলে হাজার হাজার মানুষ এবং স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ সবার যাতায়াত সুগম ও নিরাপদ হবে। বিশেষ করে ওই এলাকার কৃষিজীবী মানুষ তাদের কৃষিপণ্য সহজে ও স্বল্পমূল্যে পরিবহন এবং বাজারজাত করতে পারবেন। উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পাবেন। কিছুদিন আগে সেতুটির জন্য আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।’
সমাজ সহিলদেও ইউনিয়নের উপ সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি) খালেদ হোসেন জানালেন, সেতুটি হলে উভয় পাশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সবার যাতায়াত নিরাপদ হবে। বিশেষ করে ওই এলাকার কৃষিজীবী মানুষের সুবিধা হবে।
মোহনগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী ইকরামুল হোসেন আগামীর সময়কে জানান, সেতু নির্মাণের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমি একবার গিয়ে দেখে এসেছি। অনুমোদন হলে ভবিষ্যতে সেতুটি হবে।