Image description

দেশে প্রতিবছর বাড়ছে বজ্রপাতে মৃত্যু। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে এপ্রিল-মে মাসে ধান কাটার মৌসুমে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত ৭ দিনেই বজ্রপাতে ৭১ জন মারা গেছেন। সব মিলিয়ে এ বছর মৃত্যু শতাধিক।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বছরে বজ্রপাতে গড়ে ৩০০ জনের মৃত্যু হয়। অথচ নব্বইয়ের দশকে গড় মৃত্যু ৩০ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

যদিও ২০২০ সালের পর মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২০ সালে যেখানে ৪২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল, ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৬৩ জনে, ২০২৫ সালে ২৬৩–এ নেমে আসে। তবে চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই শতাধিক মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১৫ বছরে বজ্রপাতে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা উঠে এসেছে ২০১৮ সালে প্রকাশিত রোনাল্ড এল. হোলি এবং অন্যান্যদের গবেষণায়। সেখানে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার ২ দশমিক ০৮ জন।

মৃত্যু বাড়ছে ৩ কারণে

গবেষকেরা বলছেন, দেশে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, উন্মুক্ত স্থানে কাজ। নিহতদের প্রায় ৮০ শতাংশই প্রান্তিক কৃষক ও জেলে। বোরো ধান কাটার মৌসুম (এপ্রিল-মে) এবং বজ্রপাতের মৌসুম একই সময়ে হয়। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও ফসল ঘরে তোলার জন্য খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি মারা যান।

দ্বিতীয়ত, বড় গাছের অভাব। প্রাকৃতিকভাবে বজ্রপাত শুষে নেওয়ার মতো উঁচু গাছ (যেমন- তাল বা সুপারি গাছ) গ্রামাঞ্চল থেকে নির্বিচারে কেটে ফেলা হয়েছে। খোলা মাঠে যখন কোনো গাছ থাকে না, তখন সেখানে থাকা মানুষটিই সবচেয়ে উঁচু বস্তুতে পরিণত হন এবং সরাসরি বজ্রপাতের শিকার হন।

তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে উত্তরের ঠান্ডা বাতাসের সংঘর্ষ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এর ফলে সৃষ্ট তীব্র ‘কনভেক্টিভ এনার্জি’ ভয়াবহ বজ্রঝড়ের সৃষ্টি করছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বজ্রপাতে বার্ষিক মৃত্যুর পরিসংখ্যানদুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বজ্রপাতে বার্ষিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান

মৃত্যুকূপ হাওরাঞ্চল, সবচেয়ে ঝুঁকিতে সুনামগঞ্জ

গত বছর (২০২৫) ‘প্রোগ্রেস ইন ডিজাস্টার সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলগুলো বজ্রপাতের প্রধান শিকার। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট জেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

চলতি মাসের ১৮ এপ্রিল একদিনেই সুনামগঞ্জের চার উপজেলায় পাঁচজনের মৃত্যু হয় বজ্রপাতে। ২৬ এপ্রিল তিনজন মারা গেছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ত্রাণ ও দুর্যোগ শাখার তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে সুনামগঞ্জে ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

‘হিলিয়ান’ জার্নালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও গাছপালার অভাব থাকায় হাওরাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আট বছরে শুধু সুনামগঞ্জেই ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিএমডির তথ্য বলছে, প্রতিবছর হাওরাঞ্চলের ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ বজ্রাঘাতে হতাহতের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকেন।

সর্বস্বান্ত হচ্ছে পরিবার

স্প্রিংগার প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বজ্রপাতে নিহতদের ৭৪ শতাংশই পুরুষ। তাদের অধিকাংশই পরিবারের একমাত্র বা প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

র‍্যাপিডের প্রতিবেদন বলছে, পরিবারের কর্তার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, মহাজনের ঋণ বা এনজিওর কিস্তি শোধ করতে গিয়ে নিহতের পরিবারগুলো শেষ সম্বল জমি বা গবাদিপশু বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডিস্ট্রেস সেল’। এর ফলে পরিবারগুলো এক নিমিষেই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে পড়ে। এর ওপর বজ্রপাতে গবাদিপশুর মৃত্যু কৃষকদের আরও বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বেঁচে ফেরা মানুষের শরীরে ভয়াবহ ছাপ

বজ্রপাতে যারা মারা যান না, তাদের জীবনও হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। বজ্রপাত কেবল তাৎক্ষণিক মৃত্যুই ঘটায় না, বেঁচে ফেরা মানুষের শরীরে স্থায়ী ক্ষত রেখে যায়।

‘জেএএফএমসি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বজ্রপাতে আহতদের ৩৫ শতাংশের স্নায়ুতন্ত্র (নার্ভাস সিস্টেম) এবং ৩০ শতাংশের হৃদযন্ত্র চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কানের পর্দা ফেটে যাওয়া, চোখে ছানি পড়া, শরীরের একাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) হওয়া ও স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার মতো ঘটনা খুবই সাধারণ। এর পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হওয়ার আজীবন যন্ত্রণা তো রয়েছেই।

করণীয় কী

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে সতর্ক করা হলেও শুধু সচেতনতা দিয়ে এই মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ।

এই বিশেষজ্ঞ স্ট্রিমকে বলেন, ‘বৃষ্টি বা ঝড়ের সময় রাস্তার পাশে বা খোলা মাঠে দাঁড়ানো যাবে না—এটা সবাই জানে। যিনি মাঠে কাজ করেন, তিনিও জানেন। কিন্তু জীবন ও জীবিকার তাগিদেই তারা ঝুঁকি নেন। ধরুন, একজন কৃষক বা দিনমজুর এক হাজার টাকা চুক্তিতে মাঠে কাজ করতে গেছেন। হঠাৎ ঝড় শুরু হলে আধা ঘণ্টার জন্য জমির মালিক কি তাকে ছুটি দেবেন? মালিক যদি তাকে আশ্বস্ত না করেন যে, এই ছুটির কারণে তার মজুরি কাটা যাবে না, তবে ওই শ্রমিক তো মাঠ ছাড়বেন না। আবার ঝড়-বৃষ্টির সময় নদীতে বা হাওরে মাছ বেশি পাওয়া যায় বলে জেলেরাও জেনেশুনেই ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরতে নামেন।’

কৃষকের সম্পদের সুরক্ষার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘মাঠে যদি একটা গরু বাঁধা থাকে, ঝড় এলে মানুষ তো সেটা আনতে দৌড়াবেই। কারণ, এটা তার জীবনের বড় সম্বল। তাই শুধু সচেতন করলেই হবে না। বজ্রপাতের ওই আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা কাজ বন্ধ রাখলে প্রান্তিক মানুষের যে ক্ষতিটা হবে, সেটা পুষিয়ে দেওয়ার বা তাদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার একটা হলিস্টিক বা সমন্বিত সিস্টেম তৈরি করতে হবে।’

পাশাপাশি, বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও ডিজিটালাইজড করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, মানুষ যেন সরাসরি মোবাইলের মেসেজের মাধ্যমে দ্রুত পূর্বাভাস পায়, সেই ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।