Image description

সমুদ্রবন্দরে বেসরকারি খাতকে জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ দিতে যাচ্ছে সরকার। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ব্যবসার সুবিধা বাড়ানো ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

এজন্য 'বেসরকারি জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬'-এর খসড়া প্রণয়ন করছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ১০ মে নৌপরিবহন সচিব মো. জাকারিয়া টিবিএসকে জানান, নীতিমালাটি শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার হয়েছে। আমদানি বা রপ্তানির সুবিধার্থে সমুদ্র এলাকার নিকটবর্তী স্থানে ইতোমধ্যে ব্যাপক কলকারখানা গড়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে আরও কলকারখানা দেশে স্থাপিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে আমদানি-রপ্তানি আরও বাড়বে। 

ফলে পণ্য খালাস, বোঝাইসহ অন্যান্য খাতে সুষ্ঠু সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪৩.৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আর এ সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৬৪.৩৬ বিলিয়ন ডলার। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯৩ শতাংশই হয় সমুদ্রবন্দর দিয়ে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বন্দরগুলো ৩০ লাখ টিইইউ (বিশ ফুট সমতুল্য) কনটেইনার, ১০৫ মিলিয়ন টন কার্গো ও ৪ হাজার ৫০০টি জাহাজ হ্যান্ডল করেছে।

অনেক সময় বন্দরের বর্তমান সক্ষমতায় কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হয় না। এতে বন্দরে জট সৃষ্টি হয়, কারখানায় কাঁচামাল পৌছাতে বা রপ্তানি গন্তব্যে পণ্য পৌঁছাতে বাড়তি সময় লেগে যায়।

জেটি বা বার্থ হচ্ছে বন্দরের এমন একটি স্থাপনা যেখানে প্ল্যাটফর্ম, র‌্যাম্প ও ঘাট থাকে। এখানে জাহাজ নিরাপদে অবস্থান করে পণ্য খালাস, বোঝাই ও ট্রান্সশিপমেন্ট (এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে পণ্য দেওয়া বা নেওয়া) করতে পারে।

খসড়া নীতিমালা অনুসারে, বন্দরের সীমানায় রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে এ ধরনের জেটি স্থাপন করতে পারবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। এজন্য নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে।

বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সাথে সরকারের শেয়ার রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানও যৌথভাবে এ ধরনের জেটি স্থাপন করতে পারবে।

নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে

ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

তিনি বলেন, 'এতে দেশ দেশের উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন। কারণ যত বেশি টার্মিনাল হবে, বন্দরের বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস চার্জ তত কমে আসবে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের বন্দরের কার্যক্রম বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তি আসবে, যাতে বন্দর সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সহজ ও দ্রুত হবে।'

তবে তিনি এ-ও বলেন যে, বন্দরে জেটি নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব কে পাবে, তার পদ্ধতি হতে হবে স্বচ্ছ।

আজম জে চৌধুরী বলেন, 'যোগ্য প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব না পেলে এই নীতিমালার সুবিধা পাওয়া যাবে না। আর্থিক ও কারিগরিভাবে যোগ্য প্রতিষ্ঠান যাতে দায়িত্ব পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।'

তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান টিবিএসকে বলেন, জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করলে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে।

'গ্রাহকরা যেখানে ভালো সেবা পাবেন, সেখানেই যাবেন। ফলে সরকারের ও বেসরকারি খাতের সেবার মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। এতে গ্রাহকরা আরও ভালো সেবা পাবেন,' বলেন তিনি।

বিশ্বজুড়ে বন্দর ব্যবস্থাপনার চিত্র

বন্দর-সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বে চার ধরনের বন্দর ব্যবস্থাপনা রয়েছে—সার্ভিস পোর্ট, টুল পোর্ট, ল্যান্ডলর্ড পোর্ট ও পিউর প্রাইভেট পোর্ট।

সরকার ল্যান্ডলর্ড পোর্ট কাঠামোতে বেসরকারি খাতে জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেয়।

ল্যান্ডলর্ড পোর্টে জমির মালিকানা সরকারের, বাকি সব অবকাঠামো বেসরকারি খাত স্থাপন করে পরিচালনা করে থাকে। বাংলাদেশের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল এ ধরনের বন্দরের মধ্যে পড়ে।

চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর বর্তমানে টুল পোর্ট ব্যবস্থাপনায় চলছে। 

টুল পোর্ট হচ্ছে যেখানে জমি, অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি সবই রাষ্ট্রের বা বন্দর কর্তৃপক্ষের মালিকানায় থাকে, কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেই সরঞ্জামগুলো ব্যবহার করে পণ্য লোড-আনলোডের কাজ পরিচালনা করে। 

সার্ভিস পোর্ট হচ্ছে এমন বন্দর যার জমি, অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি, শ্রমিক কর্মচারীসহ সবকিছুই রাষ্ট্রমালিকানাধীন হয়ে থাকে। 

পিউর প্রাইভেট পোর্টে জমি থেকে শুরু করে সবকিছুর শতভাগ মালিকানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের থাকে। ভারতে আদানির মালিকানাধীন মুনদারা বন্দর এ ধরনের বন্দর। এছাড়া ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বন্দর রয়েছে।

খসড়া নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, বেসরকারি জেটি ও টার্মিনালকে সংশ্লিষ্ট বন্দরের অপারেশন সিস্টেম অথবা সংশ্লিষ্ট বন্দর কর্তৃক অনুমোদিত অটোমেটেড অপারেশন সিস্টেম ব্যবহার করতে হবে। এজন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত ফি দিতে হবে। 

শুল্ক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বেসরকারি জেটিতে শুল্ক কর্মকর্তাদের কাজের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে দিতে হবে। 

কার্গো লোডিং, আনলোডিং ও হ্যান্ডলিংয়ের কাজে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, যাতে ব্যবহারকারীর সময়, খরচ ও ব্যক্তিক উপস্থিতির প্রয়োজন কম হয়। 

বেসরকারি জেটিতে পণ্য আমদানি, রপ্তানি ও হ্যান্ডলিংয়ের ট্যারিফ বা ফি বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে। 

বেসরকারি জেটি মালিকরা ও বন্দর কর্তৃপক্ষ আলাদা ট্যারিফ শেয়ারিং চুক্তি করবে, যার মাধ্যমে ঠিক হবে ওই জেটি ও টার্মিনাল থেকে যে আয় হবে তার কত অংশ কে পাবে।

খসড়া নীতিমালার তথ্য অনুযায়ী, এই জেটি বা টার্মিনাল স্থাপনের জন্য আবেদন ফি ধরা হবে ২০ লাখ টাকা। এটি অফেরতযোগ্য। 

যে প্রতিষ্ঠান এ ধরনের জেটি বা টার্মিনাল স্থাপনের অনুমোদন পাবে, তাদেরকে সরকারের কাছে এক কোটি টাকা জামানত রাখতে হবে।

সমুদ্রবন্দর ব্যবহারকারী দের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্যরা। কারণ দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি হয় তৈরি পোশাক খাতের পণ্য। 

এসব পণ্য তৈরির তুলা, সুতা, কাপড়সহ অন্যান্য কাঁচামালও এ খাতের ব্যবসায়ীরা আমদানি করে থাকেন।

বর্তমানে দেশে তিনটি সমুদ্রবন্দর রয়েছে—চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা। এছাড়া মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণাধীন; এটি চলতি বছরেই চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

 দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। এখানে বর্তমানে ১৮টি জেটি ও কনটেইনার টার্মিনাল রয়েছে। এ বন্দরে জেনারেল কার্গো বার্থ ও কনটেইনার টার্মিনালের পাশাপাশি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালও রয়েছে।