Image description

রাজশাহী আঞ্চলিক বিআরটিএ কার্যালয়ে সেবার নামে দীর্ঘদিন ধরে চলা ভোগান্তি ও অনিয়ম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ যেন নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

 

ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস সনদ, রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা পরিবর্তন ও নবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো নিতে গিয়ে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং অতিরিক্ত টাকা ছাড়া কাজ না হওয়ার ক্ষুব্ধ সেবাগ্রহীতারা।

 

ভোগান্তির আড়ালে ঘুষের ফাঁদ

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিদিন অনলাইনে প্রায় শতাধিক ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন জমা পড়লেও সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য পথটি মোটেও মসৃণ নয়। বায়োমেট্রিক, লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার দীর্ঘ প্রক্রিয়া পার হতে গিয়ে পদে পদে বাধার মুখে পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা। অভিযোগ আছে, দালাল বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ন্যূনতম ৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা ‘কন্টাক্ট’ না করলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া প্রায় অসম্ভব।

 

পবা বাগসারা থেকে আসা এক ভুক্তভোগী জানান, টাকা না দিলে পরীক্ষায় ছোটখাটো ভুল ধরে অকৃতকার্য করে দেওয়া হয়। অথচ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টাকা জমা দিলে কোন ঝামেলা ছাড়াই মিলছে লাইসেন্স। টাকা দিলে কাজ হয় পানির মতো সহজ, আর না দিলে মাসের পর মাস লার্নার কার্ড নিয়ে ঘুরতে হয়।

 

শোরুম ভিত্তিক ঘুষ লেনদন

বিআরটিএ কর্মকর্তারা সরাসরি টাকা লেনদেনের ঝুঁকি নেন না। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, রাজশাহীর বেশ কিছু মোটরসাইকেল শোরুমের মালিক ও ম্যানেজাররা এই ঘুষের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন।

 

এ ক্ষেত্রে হালকা লাইসেন্স (মোটরসাইকেল/কার): সরকারি ফির বাইরে সর্বনিম্ন ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। ভারী লাইসেন্স (ট্রাক/বাস): ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। ফিটনেস সার্টিফিকেট: ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা।

 

ভুক্তভোগীদের মতে, যারা এই ‘প্যাকেজ’ গ্রহণ করেন, তাদের লিখিত বা ব্যবহারিক পরীক্ষায় কোনো বাধা পেতে হয় না। এমনকি পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত না হয়েও লাইসেন্স পাওয়ার নজির রয়েছে বলে অনেক সেবাগ্রহীতা দাবি করেছেন।

 

নওহাটা থেকে আসা আবেদনকারী জাকির হোসেন ক্ষোভ নিয়ে বলেন, ‘আমি মাসের পর মাস লার্নার নিয়ে ঘুরছি। সব ঠিক থাকলেও পরীক্ষায় কোনো না কোনো অজুহাতে আমাকে অকৃতকার্য করে দেওয়া হয়। অথচ আমার পরিচিত একজন শোরুমের মাধ্যমে টাকা দিয়ে এক সপ্তাহেই সব ক্লিয়ার করে ফেলেছে।’

 

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ট্রাকচালক জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘টাকা না দিলে ফিটনেস ফাইলে হাজারটা ভুল ধরা হয়। কিন্তু দালালের মাধ্যমে টাকা ধরালেই সেই ভুলগুলো মুহূর্তেই সঠিক হয়ে যায়। টাকা ছাড়া বিআরটিএতে কোনো ফাইল নড়ে না।’

 

কার্যালয়ের বাইরে মিনি অফিস

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিআরটিএ কার্যালয়ের আশপাশে সক্রিয় কিছু দালাল ও ব্যবসায়ী সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

 

সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যালয়ের ভেতরের কিছু অসাধু ব্যক্তি জড়িত থাকায় অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া কাজ এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়াও বিআরটিএ কার্যালয়ের বাইরে বিশেষ করে ছোট দোকান ও কম্পিউটার বা ফটোকপির দোকানের আড়ালে সক্রিয় দালাল চক্র। সরাসরি কাজ না করে, বাইরে এসব দোকানে বসে তারা লার্নার লাইসেন্স, ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন, ফিটনেস, এবং মালিকানা পরিবর্তনের কাজ দ্রুত করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়।

 

সিন্ডিকেটের নেপথ্যে যারা

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন জমা পড়ে। এই বিশাল সংখ্যক আবেদনকারীর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ৫ সদস্যের একটি বোর্ড থাকলেও অভিযোগ রয়েছে ‘ক্লিয়ারেন্স’ আসে অদৃশ্য এক সিন্ডিকেটের কাছ থেকে।

 

এই চক্রের মূলহোতা হিসেবে অভিযোগের আঙুল উঠেছে বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক সুমন হোসেন, সহকারী পরিদর্শক রাশেদুল ইসলাম এবং রাজস্ব কর্মকর্তা আতাউর রহমান, অফিস সহায়ক আলী ও হিটলার এবং অস্থায়ী কর্মচারী জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে।

 

প্রশাসনিক শূন্যতা

সংশ্লিষ্টদের দাবি, কয়েক মাস ধরে পূর্ণকালীন সহকারী পরিচালক না থাকায় তদারকির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী কার্যত পুরো সেবা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের সম্মতি ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক লাইসেন্স আবেদন এবং ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন ও মালিকানা পরিবর্তনের কাজ বিবেচনায় নিয়ে সেবা প্রত্যাশীদের ধারণা, প্রতিমাসে বিপুল অনৈতিক অর্থ লেনদেন হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন আবেদন চালু হলেও যদি মাঠপর্যায়ে দালালচক্রের প্রভাব থেকে যায়, তবে ডিজিটাল ব্যবস্থার সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। তারা স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ,‌ র‌্যান্ডম অডিট এবং দুর্নীতির অভিযোগে দ্রুত তদন্তের সুপারিশ করেন।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পরিচালকের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. শাহজামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এই অভিযোগের কোনো সত্যতা আছে বলে আমার জানা নাই। তার পরেও কোনো অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’