ভোরের জঙ্গল তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। বান্ধবগড়ের খিতৌলি অঞ্চলের ধামধামা ক্যাম্পের চারপাশে কুয়াশার মতো নীরবতা। হঠাৎ সেই নীরবতা চিরে ভেসে আসে গর্জন। একবার নয়, বারবার। গর্জনগেুলো এমন, বনরক্ষীরা বুঝে যান, জঙ্গলের ভেতর কিছু ভয়ংকর ঘটছে।
তারপর শুরু হয় খোঁজ। ঘন জঙ্গলের ভেতরে কিছুদূর যেতেই তারা দেখতে পান বিশাল এক রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিথর হয়ে পড়ে আছে। শরীরে গভীর ক্ষতচিহ্ন। ঘাড়ের হাড় ভাঙা। চারপাশে লড়াইয়ের ছাপ। সেই বাঘটির নাম ‘পূজারি’, বান্ধবগড় টাইগার রিজার্ভের অন্যতম পরিচিত পুরুষ বাঘ, যাকে পর্যটকেরা চিনতেন শান্ত স্বভাব আর ক্যামেরাবান্ধব আচরণের জন্য।
মধ্যপ্রদেশের বন কর্মকর্তারা বলছেন, নয় বছর বয়সী এই বাঘ সম্ভবত আরেক প্রভাবশালী পুরুষ বাঘ ‘ডি–ওয়ান’-এর সঙ্গে এলাকা দখলের লড়াইয়ে মারা গেছে। সোমবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে দুই বাঘের ভয়ংকর সংঘর্ষ ও গর্জনের আওয়াজ পেয়েছিলেন বনকর্মীরা। পরে জঙ্গলে পাওয়া যায় পূজারির মরদেহ। শরীরের সব অঙ্গ অক্ষত থাকায় শিকারিদের হামলার আশঙ্কা আপাতত উড়িয়ে দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
পূজারি বান্ধবগড়ের খুব পর্যটকপ্রিয় এক বাঘ ছিল। ছবি: সংগৃহীতযে জঙ্গল বাঘের জন্য ছোট হয়ে আসছে
বান্ধবগড় বহুদিন ধরেই বাঘের ঘনবসতির জন্য ভারতের বিখ্যাত বনগুলির একটি। এখানকার পাহাড়ি বন, জলাশয় আর বাঁশঝাড়ে একসময় বাঘের দেখা পাওয়া ছিল বিরল সৌভাগ্য। এখন পরিস্থিতি উল্টো। বাঘ বেড়েছে, কিন্তু জঙ্গল বাড়েনি।
আর তাই শুরু হয়েছে এলাকা দখলের লড়াই। একেকটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাঘ বেশ বড় একটি এলাকা নিজের দখলে রাখতে চায়। এটা ২০ বর্গকিলোমিটার থেকে শুরু করে ১০০ বর্গকিলোমিটার কিংবা তারও বেশি হতে পারে। সেখানে অন্য পুরুষ বাঘ ঢুকে পড়লে সংঘর্ষ প্রায় অবশ্যম্ভাবী। বেশির ভাগ সময় ভয় দেখিয়েই প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কখনও কখনও সেই লড়াই গড়ায় মৃত্যু পর্যন্ত।
বন কর্মকর্তাদের ধারণা, পূজারি ও ডি–ওয়ান একই এলাকায় বিচরণ করত। স্থানীয় বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের ভাষ্য, ডি–ওয়ানকে দেখলে অনেক সময় পূজারি এলাকা ছেড়ে সরে যেত। কিন্তু এবার হয়তো আর পিছু হটার সুযোগ পায়নি।
পূজারি ছিল পর্যটকদের প্রিয়। জঙ্গলের জলাশয়ে নেমে শরীর ভিজিয়ে ধীর পায়ে হাঁটার দৃশ্য বহু আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় বন্দী হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অসংখ্য ছবি ঘুরে বেড়ায়। তাই তার মৃত্যু অরণ্যপ্রিয় পর্যটকদের কাছে এক বনের রাজার পতনের মতোই।
এ প্রথম নয়
পূজারির মৃত্যু নতুন হলেও ঘটনাটা নতুন নয়। বান্ধবগড়ে আগেও ঝরেছে বাঘের প্রাণ। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই বান্ধবগড়ে আরেকটি পাঁচ বছর বয়সী বাঘিনী মারা যায় এলাকা দখলের সংঘর্ষে। গুরুবাহি গ্রামের কাছে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। বন বিভাগ জানিয়েছিল, অন্য একটি বাঘের সঙ্গে লড়াইয়েই মৃত্যু হয়েছিল বাঘিনীর।
এরও আগে বন বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বান্ধবগড় ও আশপাশ এলাকায় আটটি বাঘ মারা গেছে। এর মধ্যে কয়েকটির মৃত্যু হয়েছে বিদ্যুতায়িত হয়ে, আবার কয়েকটি মারা গেছে রোগ, ডুবে যাওয়া বা এলাকা নিয়ে লড়াইয়ে।
অন্য এক বাঘের আক্রমণে মৃত্যু হয় পূজারি নামের বাঘটির। ছবি: সংগৃহীতমধ্যপ্রদেশকে বলা হয় ভারতের ‘টাইগার স্টেট’। ২০২২ সালের গণনায় রাজ্যটিতে বাঘের সংখ্যা ছিল ৭৮৫—দেশে সর্বোচ্চ। কিন্তু বাঘ যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে জায়গার সংকট, সংঘর্ষ আর মৃত্যুও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণ পুরুষ বাঘেরা যখন নতুন এলাকা খুঁজতে বের হয়, তখন তাদের সামনে থাকে দুই বিপদ, মানুষের বসতি আর অন্য প্রভাবশালী বাঘ। কেউ বিদ্যুতের ফাঁদে মারা যায়, কেউ কুয়োয় পড়ে, কেউ আবার প্রতিদ্বন্দ্বী বাঘের থাবায়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বন্যপ্রাণী ফোরামগুলোতে পূজারির মৃত্যু নিয়ে শোক প্রকাশ করেছেন অসংখ্য মানুষ। কেউ লিখেছেন, “জঙ্গল যেন তার আরেক রাজাকে হারাল।” আবার কেউ বলেছেন, “বাঘেরা এখন নিজেদের মধ্যেই লড়ছে, কারণ তাদের জন্য নিরাপদ জায়গা কমে আসছে।”
তবু প্রকৃতির নিয়ম বড় নির্মম।
বান্ধবগড়ের অন্ধকার বনে হয়তো আজও হাঁটছে ডি–ওয়ান। আর কোথাও পড়ে আছে পূজারির লড়াইয়ের দাগ। ভাঙা ডাল, ছেঁড়া ঘাস আর রক্তমাখা মাটি হয়ে। কিন্তু পর্যটকদের ক্যামেরায় বন্দী সেই শান্ত, স্থির চোখের বাঘটি আর কোনোদিন জলাশয়ে নেমে দাঁড়াবে না।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য টেলেঙ্গানা টুডে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ফ্রি প্রেস জার্নাল, সোশ্যাল নিউজ এক্সওয়াইজেড, ন্যাভভারত টাইমস, রেডিটের ‘টাইগার্স অব ইন্ডিয়া’ কমিউনিটি।