Image description

এক সময় মেছো বাঘ, হরিণ আর বানরের আনাগোনায় মুখর ছিল চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীর পাহাড়। সেই পাহাড়ের বুক চিরে এখন চলছে পর্যটকদের হৈ-হুল্লোড়, সুইমিংপুলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। পাঁচ হাজারের বেশি গাছ কাটা পড়েছে, রক্ষিত বনের জমি গেছে দখলে আর নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে বনের প্রাণ।

২০১৯ সালের আগেও এই পাহাড়ে ঢোকার একমাত্র পথটি ছিল সরু, ছায়াঢাকা ও নিরিবিলি। দুই পাশে ঘন বন, মাটির গন্ধ। পাতার ফাঁকে আলোর খেলা। সেই বছরই শুরু হয় মাটি-টা রিসোর্টের নির্মাণ কাজ। এক্সকাভেটর নামে পাহাড়ে। গাছ পড়তে থাকে একের পর এক। মাটি কাটা হয়, সমতল করা হয়, ঢালু পাহাড়ের গায়ে তৈরি হয় সিঁড়ি আর দেয়াল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাটি-টা রিসোর্ট নির্মাণে কাটা পড়েছে অন্তত পাঁচ হাজার গাছ। কেটে ফেলা হয়েছে পাহাড়ের একাংশ। দুই পাশের পাহাড়ে গাছ সাফ করে গড়া হয়েছে নানা স্থাপনা। একটি পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে বড় মাঠ।

ভাটিয়ারীর পুরোনো বাসিন্দা রহিম মিয়ার বয়স এখন সত্তরের কোঠায়। ছোটবেলায় এই পাহাড়ে কাঠ কুড়াতে যেতেন। তখন মাঝেমধ্যেই দেখা মিলত মেছো বাঘের। হরিণ ছুটত ঝোঁপের আড়ালে। বানরের দল লাফিয়ে বেড়াত ডাল থেকে ডালে। সেই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, আগে ভোরবেলা পাখির ডাকে ঘুম ভাঙত। এখন ভাঙে জেনারেটরের শব্দে।

রহিম মিয়ার স্মৃতির সেই পাহাড় আজ আর নেই। চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে সোনাইছড়ি রক্ষিত বনের দক্ষিণ অংশজুড়ে এখন দাঁড়িয়ে আছে মাটি-টা রিসোর্ট। এতে রয়েছে সুইমিংপুল, কৃত্রিম হ্রদ, বহুতল ভবন আর অ্যাডভেঞ্চার পার্ক। রয়েছে ৩০০ মানুষের রাত্রিযাপনের সুবিধাও।

মাটি-টা রিসোর্টের মালিক মুনাল মাহবুব ও তাসনিম মাহমুদ। মুনাল মাহবুব চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি এবং এফবিসিসিআইয়ের একাধিক মেয়াদের সভাপতি মাহবুবুল আলমের মেয়ে। আওয়ামী লীগের ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত মাহবুবুল আলম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এফবিসিসিআই সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পারিবারিক প্রভাবই রিসোর্টটিকে বছরের পর বছর জবাবদিহির বাইরে রেখেছে। বন বিভাগ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ— কেউ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

সচেতন নাগরিক কমিটির চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, যে সময়ে এই রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, সে সময় দেশে আইনের শাসন ছিল না। প্রভাবশালীরা নিজেদের মতো করে আইনকে ব্যবহার করেছেন।

পরিবেশবিদ ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, প্রতিটি বনের নিজস্ব বাস্তুসংস্থান গড়ে উঠতে দশকের পর দশক লাগে। কিন্তু ধ্বংস করতে লাগে মাত্র কয়েক মাস। এটির সবচেয়ে বড় উদাহরণ মাটি-টা রিসোর্টটি।

নীরব হয়েছে পাহাড়

স্থানীয়রা জানান, এক সময় এই পাহাড়ে মেছো বাঘ, হরিণ, বানর ও নানা প্রজাতির পাখি ছিল। রিসোর্ট নির্মাণের পর থেকে এসব প্রাণী আর দেখা যায় না।

বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনে মানুষের আগ্রাসন শুরু হলে বন্যপ্রাণী আগে সরে যায়। তারপর ভেঙে পড়ে খাদ্যশৃঙ্খল। একে একে বিলুপ্ত হতে থাকে প্রজাতি।

ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, একসঙ্গে অনেক মানুষ যখন বনে হাঁটাচলা করে, শব্দ করে, আলো জ্বালে-বন্যপ্রাণীরা ভয়ে দূরে সরে যায়। তারা আর ফেরে না।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আগে রাতে শেয়ালের ডাক শুনতাম। এখন শুনি রিসোর্টের মিউজিক। পাহাড়টা যেন আর আমাদের না।

মাটি-টা রিসোর্টের পাশের পাহাড়টি কুমিরা ফরেস্ট রেঞ্জের অধীনে দক্ষিণ জঙ্গল সোনাইছড়ি রক্ষিত বনের অংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে বন বিভাগ সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা লাগিয়েছিল। সেই গাছ কাটা হয়েছে, জমি দখল হয়েছে। ২০২১ সালে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ আদালতে মামলা করে। অভিযোগ-রক্ষিত বনের ৪০ শতক জমি দখল এবং ২৫টি পরিপক্ব গাছ কর্তন। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে। অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন খারিজ হয়। তবু রিসোর্ট বন্ধ হয়নি।

উত্তর বন বিভাগের এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ করেনি) বলেন, এটি রক্ষিত বন। অনুমতি ছাড়া একটি পাতাও কাটার নিয়ম নেই। সেখানে বহুতল স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি। আমরা আদালতে মামলা করেছি। রায়ের অপেক্ষায় আছি।

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ফরেস্ট রেঞ্জার মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, আমি নতুন এসেছি। তাদের বিরুদ্ধে খবর নিয়ে অভিযান চালাব।

রিসোর্ট নির্মাণের পর বনে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে শতাধিক মানুষ জীবিকা হারিয়েছেন। মোবারক হোসেন নামে এক বাসিন্দা বলেন, বনটা ছিল আমাদের। এখন সেখানে যেতে হলে টিকিট কিনতে হয়।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে দুই পাহাড়ের মাঝে গাছ ও পাহাড় কেটে কোনো রিসোর্ট নির্মাণের সুযোগই নেই। যারা এটি বানিয়েছে এবং যারা অনুমতি দিয়েছে সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

সচেতন নাগরিক কমিটির চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, জাতীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ছাড়া কোনো পাহাড় কাটার সুযোগ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া কোনো পাহাড় ড্রেজিং বা রেজিং করারও সুযোগ নেই।

ঝুঁকিতে মিলিটারি অ্যাকাডেমি

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের একেবারে পাশে গড়ে উঠেছে রিসোর্টটি। মিলিটারি একাডেমি আর রিসোর্টের মধ্যে বাধা শুধু একটি পাহাড়ের ঢাল। সেই ঢাল এখন অনেকটাই কাটা। পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচের দিকে দৃষ্টি ফেললে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) প্রশিক্ষণ মাঠ, ক্যাডেটদের চলাচলের পথ, এমনকি মহড়ার মাঠও দৃষ্টিসীমায় পড়ে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, রিসোর্টের মতো উন্মুক্ত স্থাপনায় দেশি-বিদেশি যে কেউ প্রবেশ করতে পারেন। আধুনিক ড্রোন ও উচ্চক্ষমতার ক্যামেরা এখন সাধারণ পর্যটকদের হাতেও থাকে। সামরিক অ্যাকাডেমির প্রশিক্ষণ রুটিন, মার্চপাস্ট, আগ্নেয়াস্ত্র মহড়া—এ সবকিছু পাহাড়ের উচ্চতা থেকে অনায়াসে দেখা বা ধারণ করার সুযোগ তৈরি হয়, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।

জানতে চাইলে আন্তঃবাহিনী গণসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি-উদ-দৌলা চৌধুরী এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মালিকপক্ষের ভাষ্য : সব অভিযোগ মিথ্যা

সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রিসোর্টের পরিচালক তাসনিম মাহমুদ। তার দাবি, বন বিভাগ যে জমি দখলের অভিযোগ এনেছে, সেটির মালিক নূরজাহান গ্রুপ। গাছ কাটার বিষয়ে তিনি বলেন, বন বিভাগ কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পেয়ে দুই মাস পরে মামলা করেছে।

তিনি আরো দাবি করেন, জমির মৌজা সীমানায় জরিপগত গরমিলের কারণে আদালতে বিএস রেকর্ড সংশোধনের মামলা করেছিলেন এবং রায় তার পক্ষে এসেছে বলে জমি দখলে নিয়েছেন। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামলার রায়ের আগেই জমি দখল করা হয়েছে এবং মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন।