রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে সিগন্যাল বাতি লাল হলেও অনেক চালক এখন আর আগের মতো নিশ্চিন্তে তা অমান্য করতে পারছেন না। কারণ, মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে না থাকলেও তাদের ওপর নজর রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত ক্যামেরা। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের বাঁশি বা হাতের ইশারা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হচ্ছে ট্রাফিক আইন ভাঙার দৃশ্য। পরে সেই ফুটেজ যাচাই-বাছাই শেষে দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল মামলা।
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালের পাশাপাশি বসানো হয়েছে এআই-ভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ই-প্রসিকিউশন বা ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাও।
ট্রাফিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার ফলে সড়কে সরাসরি পুলিশি হস্তক্ষেপ কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে, পুরো ব্যবস্থাটি কার্যকর করতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, পর্যাপ্ত জনবল ও জনসচেতনতা— এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। রোববার (১০ মে) পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ট্রাফিক আইন অমান্যের আড়াই হাজারের বেশি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে সেগুলো যাচাই-বাছাই করছে ট্রাফিক পুলিশের টেকনিক্যাল টিম (টিটিইউ)। যাচাই শেষে আইন অনুযায়ী মামলা ও নোটিশ পাঠানো হবে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিক ও চালকদের কাছে।
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। শাহবাগ, বাংলামোটর ও কারওয়ান বাজারসহ অন্তত ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এই প্রযুক্তি চালুর প্রথম তিন দিনেই সিগন্যাল অমান্য ও ট্রাফিক আইন ভাঙার আড়াই হাজারের বেশি ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে, যা যাচাই-বাছাই করে ডিজিটাল মামলা দেওয়া হবে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীর অন্তত ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে এই প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে। এসব ক্যামেরা লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না পরা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, অবৈধ পার্কিং ও অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো বিভিন্ন অপরাধ শনাক্ত করছে।
যেসব এলাকায় এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে শাহবাগ, হাইকোর্ট ক্রসিং, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মসজিদ ক্রসিং, পুলিশ ভবন, পুরাতন রমনা থানা ক্রসিং, বাংলামোটর, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, রামপুরা ট্রাফিক বক্স, মিরপুর রোডের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এলাকা, গাবতলী ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।
স্পট রিপোর্ট : কারওয়ান বাজার মোড়
ট্রাফিকের নতুন এআই ক্যামেরার প্রভাব সোমবার (১১ মে) সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজার মোড়ে সরেজমিনে দেখা গেছে। ব্যস্ত এই সড়কে যানবাহনের চাপ আগের মতোই থাকলেও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মোড়ের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত এআই সক্ষম ক্যামেরা দিয়ে সিগন্যাল অমান্য, স্টপলাইন ভঙ্গ ও উল্টো পথে চলাচলের মতো ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
দেখা গেছে, সিগন্যাল পরিবর্তনের সময় অনেক চালক আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হচ্ছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে বলে দায়িত্বরত ট্রাফিক সদস্যরা জানান। আগে যেখানে ট্রাফিক পুলিশ না দেখলে অনেক চালক সিগন্যাল অমান্য করতেন, এখন ক্যামেরার উপস্থিতি তাদের আচরণে পরিবর্তন আনছে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার ফলে সড়কে ট্রাফিক পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমবে এবং আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে। এআই ক্যামেরা লাল বাতি অমান্য, উল্টো পথে চলা ও হেলমেট না পরার মতো অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে। নতুন এই ব্যবস্থার কারণে চালকদের মধ্যে সতর্কতা ও নিয়ম মানার প্রবণতা বাড়ছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে, যা যানজট নিরসনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে
এ বিষয়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট ও ট্রাফিক ইন্সপেক্টররা জানান, এআই ক্যামেরা চালুর পর আইন লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। আগে অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক সদস্যদের সরাসরি উপস্থিত থেকে গাড়ি থামিয়ে ব্যবস্থা নিতে হতো, এতে সময় ব্যয় হওয়ার পাশাপাশি যানজটও তৈরি হতো। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ হওয়ায় কাজের চাপ কিছুটা কমেছে এবং প্রমাণভিত্তিক মামলা দেওয়া সহজ হচ্ছে। তারা বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্বরত ডিএমপির ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) মো. সবদুল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আগে আইন ভাঙা গাড়ি থামিয়ে ব্যবস্থা নিতে গেলে সড়কে জটলা তৈরি হতো। অনেক সময় গাড়ি থামানো, কাগজপত্র যাচাই ও মামলা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগত। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে ফুটেজ সংগ্রহ হওয়ায় আমরা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বেশি মনোযোগ দিতে পারছি।’
একই ধরনের কথা বলেন ওই মোড়েই দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট সুজয়। তিনি জানান, আগে কাগজের স্লিপে মামলা দিতে হতো। এতে অনেক সময় লেখাজনিত সমস্যা থাকত, আবার রাস্তার মধ্যেই গাড়ি থামানোর কারণে যানজট তৈরি হতো। এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রমাণভিত্তিক মামলা দেওয়া সহজ হচ্ছে।
চালক ও যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে এআই-চালিত ক্যামেরা বসানোর পর চালক ও যাত্রীদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অনেক চালক এখন আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে সিগন্যাল মেনে চলছেন বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। চালকরা বলছেন, কোথায় কখন ক্যামেরায় আইন ভঙ্গের ফুটেজ ধারণ হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না, ফলে বাধ্য হয়েই নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা বাড়ছে। এতে সড়কে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন তারা।
কারওয়ান বাজার মোড়ে প্রাইভেটকার চালক আবদুল করিম বলেন, ‘আগে অনেক চালক ট্রাফিক পুলিশ না দেখলে সিগন্যাল মানতে চাইতেন না। এখন ক্যামেরা বসানোর পর সবাই একটু সতর্ক হয়ে গেছেন। কারণ, কোথায় কখন ফুটেজ ধারণ হয়ে যাচ্ছে, সেটা কেউ বুঝতে পারছে না। এতে চালকরা আগের চেয়ে বেশি নিয়ম মানছেন।’
বাংলামোটর মোড়ে অপেক্ষমাণ বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমা আক্তার বলেন, ‘আগে অনেক সময় সিগন্যাল অমান্য করে গাড়ি চলাচলের কারণে রাস্তা পার হতে ভয় লাগত। এখন চালকরা কিছুটা ধীরে ও সতর্কভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন।’ প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হলে সড়কে শৃঙ্খলা আরও ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তন ও প্রযুক্তি
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগে সড়কে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কাগজের স্লিপে মামলা দেওয়া হতো। পরে ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সিস্টেমের অংশ হিসেবে পস (পয়েন্ট অব সেল) মেশিন চালু করা হয়। তবে, সড়কে গাড়ি থামিয়ে তাৎক্ষণিক মামলা ও জরিমানা আদায়ের কারণে যানজট আরও বাড়ত। সেই সমস্যা কমাতেই এআই-ভিত্তিক ক্যামেরা ব্যবস্থার দিকে যায় ডিএমপি।
আরও জানা গেছে, রাজধানীতে স্থাপন করা এসব ক্যামেরায় ব্যবহার করা হচ্ছে ‘রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট-২০১৮ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যার’। ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহনের নম্বর প্লেট শনাক্ত করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে সেই তথ্য যাচাই করে মামলা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মালিক বা চালকের মোবাইলে এসএমএস এবং ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হবে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
তবে, নতুন এই ব্যবস্থায় কিছু জটিলতাও সামনে এসেছে। অনেক যানবাহনের নম্বর প্লেট অস্পষ্ট, আবার কিছু গাড়িতে নম্বর প্লেটই নেই। ফলে ক্যামেরা সেসব যানবাহন শনাক্ত করতে পারছে না। এই কারণে শিগগিরই গণবিজ্ঞপ্তি জারি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রাফিক বিভাগ।
এই বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের রেসপন্স বুঝতে একটু সময় লাগবে, আমরা মাত্র শুরু করলাম। রেসপন্স লোকজনের কাছে যাবে, মামলা পৌঁছাবে, লোকজন দেখবে; তারপর রিয়্যাকশন জাজ করতে একটু সময় লাগবে। সার্ভারের সক্ষমতা অনুযায়ী আমাদের লোকগুলো কাজ করছে। সেই ক্ষেত্রে আমরা একটু গো-স্লো (ধীরে) যাচ্ছি। তবে, শিগগিরই আমাদের কাজগুলো যখন শেষ হয়ে যাবে, তখন আমরা পরিসংখ্যানগুলো জানিয়ে দেব।’

তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজারের বেশি ফুটেজ জমা হয়েছে। এসব ফুটেজ যাচাই-বাছাই করছে আমাদের টেকনিক্যাল টিম। ডিএমপির ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট (টিটিইউ) মূলত এই ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করছে। এই ইউনিটে বর্তমানে জনবল সংখ্যা সাতজন। তবে, আস্তে আস্তে আমরা জনবল বাড়াব। এসব ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আগামী সাত দিনের মধ্যে চালক ও মালিকদের মোবাইল ফোনের এসএমএসের মাধ্যমে ও ডাকযোগে নোটিশ চলে যাবে।
এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা গেছে কি না— জানতে চাইলে ডিএমপির এই অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ‘কিছু গাড়ির নম্বর প্লেট অস্পষ্ট, কিছু জিনিস আমরা শনাক্ত করতে পারছি না, বোঝা যাচ্ছে না, এমন হয়। তবে, আমরা দ্রুত একটি গণবিজ্ঞপ্তি দেব যাতে করে ঢাকায় কোনো যানবাহন নম্বর প্লেট ছাড়া চলাচল না করে এবং নম্বর প্লেট যেন স্পষ্ট থাকে।’