দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে সাংবাদিক যখন অভিযুক্ত ব্যক্তির মন্তব্য নিতে যান, তখন প্রায়ই প্রথম চাপ আসে মালিকপক্ষের ওপর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরাসরি ফোন করে সংবাদটি প্রকাশ বা সম্প্রচার বন্ধ করার চেষ্টা করেন। এরপরও কাজ না হলে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা বা সরকারের উচ্চপর্যায়কে ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এ মন্তব্য করেছেন শিল্প ও গণমাধ্যম উদ্যোক্তা, হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ। শনিবার রাজধানীর র্যাডিশন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স’ এর দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় এ কথা বলেন তিনি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মালিকানাগত চাপ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য দেন এ. কে. আজাদ। তাঁর মালিকানাধীন গণমাধ্যমে সাংবাদিকরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না—এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি তাঁর বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ও সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরেন।
এ. কে. আজাদ জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই তাঁর কাছে প্রথম অগ্রাধিকার। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, সৎ সাংবাদিকতা কিংবা গণতান্ত্রিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবতায় ব্যবসা ও কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি অনেক সময় সামনে চলে আসে।
তিনি বলেন, ‘আমার যে চ্যানেল ২৪ এবং সমকাল—এখানে সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। কেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না? তার মূল অন্তরায় কারণ আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখানে আমার ৭৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করে, তাদের স্বার্থটা আমাকে আগে দেখতে হবে। তারপরে সৎ সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কিংবা গণতন্ত্র—এগুলো আমার কাছে সেকেন্ডারি; ফান্ডামেন্টাল হলো এদের প্রটেকশন।’
তিনি জানান, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে একজন প্রতিবেদককে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয় এবং নানা ঝুঁকি নিতে হয়। কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে সাংবাদিক যখন অভিযুক্ত ব্যক্তির মন্তব্য নিতে যান, তখন প্রায়ই প্রথম চাপ আসে মালিকপক্ষের ওপর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরাসরি ফোন করে সংবাদটি প্রকাশ বা সম্প্রচার বন্ধ করার চেষ্টা করেন। এরপরও কাজ না হলে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা বা সরকারের উচ্চপর্যায়কে ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
এ.কে. আজাদ বলেন, অনেক সময় তিনি নিজেই সাংবাদিকদের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। কিন্তু তখন সাংবাদিকদের কাছ থেকে তিনি কঠিন প্রতিক্রিয়া পান। সাংবাদিকরা জানান, যদি সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ না করা হয়, তাহলে তথ্যদাতা মনে করতে পারেন, কোনো বিনিময়ের মাধ্যমে সংবাদটি গোপন রাখা হয়েছে। এতে সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, একজন গণমাধ্যম উদ্যোক্তা হিসেবে এই অবস্থান তাঁর ব্যক্তিগত বিবেককেও নাড়া দেয়। একদিকে সাংবাদিকের স্বাধীনতা, অন্যদিকে সম্ভাব্য প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার চাপ—এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে তাঁকে চলতে হয়।
এ.কে. আজাদ আরও বলেন, যদি গণমাধ্যম মালিকদের জন্য এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় যেখানে হয়রানি, গ্রেপ্তার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রশাসনিক বাধার আশঙ্কা থাকবে না, তাহলে মালিকপক্ষও সাংবাদিকদের কাজের ওপর অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে না।
গণমাধ্যম মালিকানার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে দুই ধরনের মালিক গণমাধ্যমে আসছেন। একদল সমাজের দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থপাচার ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করার উদ্দেশ্যে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করছেন। অন্যদিকে আরেকটি অংশ নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা, অবৈধ অর্থ বা অন্যান্য অনিয়ম আড়াল করার উদ্দেশ্যে গণমাধ্যমের মালিক হচ্ছেন।
তিনি মনে করেন, সৎ সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন এবং পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কালো টাকার মালিকদের প্রভাব থেকে গণমাধ্যমকে রক্ষা করাও সময়ের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।