ড. জান্নাতুল মুমতারিন মৌসুমী। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) রসায়ন বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের একজন শিক্ষার্থী। তিনি সম্প্রতি জাপানের কুমামোতো ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপকের চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) রসায়ন বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছেন। তার অ্যাকাডেমিক জীবনের অভিজ্ঞতা, উচ্চশিক্ষার যাত্রা, গবেষণার ক্ষেত্র ও বিদেশে উচ্চমানের চাকরি ছেড়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগদানের গল্প জানিয়েছেন চ্যানেল 24 অনলাইনকে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শাবিপ্রবি প্রতিনিধি মো. সাগর মিয়া।
সাগর মিয়া: আপনার স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের একাডেমিক অভিজ্ঞতা ও গবেষণায় হাতেখড়ির শুরুটা কীভাবে?
ড. জান্নাতুল: আমি শাবিপ্রবির রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতকে কৃতিত্বের সাথে প্রথম স্থান অর্জন করি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের সময়ে শাবিপ্রবির রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবুল হাসনাত স্যারের কাছে আমার গবেষণা জীবনের হাতেখড়ি হয়। বিভাগের ‘ইলেকট্রোকেমিস্ট্রি এন্ড কেটালাইসিস রিসার্চ ল্যাব’ (Electrochemistry and Catalysis Research Lab) এ কাজ করতে গিয়ে ডেটা সেটকে বিল্ডিং ব্লকের মতো নানা প্যাটার্নে সাজানো ও কীভাবে উপস্থাপন করতে হয় তা শিখেছি। আরও শিখেছি গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে কীভাবে সৃজনশীল চিন্তা করা যায়। ফলে দুটি আর্টিকেল (electrochimica acta) জার্নালে পাবলিশ হয়, যার একটিতে আমি ফার্স্ট অথর ও অপরটিতে সেকেন্ড অথর ছিলাম।
এই গবেষণা দুটিতে একমাত্র শিক্ষার্থী ছিলাম আমি, বাকিরা ছিলেন শিক্ষক। একমাত্র শিক্ষার্থী হওয়ার ফলে গবেষণার এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন থেকে ডেটা কালেকশন, অ্যানালাইসিস, ইন্টারপ্রিটেশন, ম্যানুস্ক্রিপ্ট লেখা, সাবমিশন ও রিভিউয়ার রেসপন্স সবই স্যারের (হাসনাত) কাছ থেকে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ হয়। এছাড়া আমি শাবিপ্রবিতে মাস্টার্সের ডিফেন্স দেয়ার একমাস আগেই ‘এসিআই হেলথ কেয়ার লিমিটে চাকরির অফার পাই। পরবর্তীতে সেখানে ‘রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ’ হিসেবে কিছু দিন চাকরি করি।
সাগর মিয়া: বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আপনার যাত্রাপথটি কেমন ছিল?
ড. জান্নাতুল: স্নাতকোত্তরে আমি ‘এনএসটি’ ও ‘টিডব্লিউএএস’ ফেলোশিপ অর্জন করি, যেখানে গবেষণা প্রোপোজাল লেখা, বাজেট নির্ধারণ, টাইম ফ্রেমিং সেট করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখার সুযোগ হয়, যা আমার বিদেশে পিএইচডি প্রোগ্রাম পাওয়াতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। তারপর আমি জাপানের কুমামোতে ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হই। সেখানে আমি Kumamoto University Doctoral Fellowship 2022 I Terada Torahiko Fellowship (2023-2025) অর্জন করি। আমার গবেষণার মানের কারণে আমি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ‘একাডেমিক এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড (দ্য প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড) পেয়ে ‘এডভান্স ইন্ডাস্টিয়াল সাইন্সে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করি।
সাগর মিয়া: জাপানে শিক্ষককতা জীবনের গল্পটা বলবেন?
ড. জান্নাতুল: এর মধ্যেই কুমামোতো ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক পদের জন্য একটি সার্কুলার প্রকাশিত হয়। সাহস করে আবেদন করি। ২০ জন বিশ্বমানের গবেষকের সাথে প্রতিযোগিতা করে আমি সেখানে নিয়োগ পাই। এটা ছিল আমার জন্য একটা মাইলফলক। এছাড়া ফিমেল রিসার্চারদের ‘রোল মডেল’ (10th Kumamoto University Female Researcher Award) ২০২৫ এ সম্মানিত হই। যেখানে কেবলমাত্র বিদেশি গবেষক হিসেবেই নয়, সবচেয়ে কম বয়েসীও ছিলাম আমি, যা আমার জন্য ছিল অত্যন্ত গর্বের।

সাগর মিয়া:জাপানে উন্নত জীবন ছেড়ে বাংলাদেশে কেন ফিরলেন?
ড. জান্নাতুল:জাপানে রয়েছে উন্নত ল্যাব, আধুনিক সব ফ্যাসিলিটি, প্রচুর গবেষণা প্রকল্প, সুযোগ-সুবিধা, কাজের অবারিত স্বাধীনতা, কর্মঠ ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মী। কিন্তু জাপানিজ শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলতে গিয়ে, ওদের নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমি প্রায়ই অনুভব করতাম বাংলাদেশের অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধায় যারা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা করেন তাদেরকে নিয়ে। তাদের জন্য আমার করণীয় আছে কি না তা নিয়ে। দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো ছাড়াও যে দেশকে দেয়ার, দেশের জন্য কাজ করার আরও অনেক সুযোগ রয়েছে তা নিয়ে।
তখন আমার মাথায় চিন্তা আসে পরিচিত একজন-দুজনের পরিবর্তে যদি নিজ দেশের অনেক মানুষের কাজে আসতে পারি, তবে একটা আত্মিক শান্তি কাজ করবে। এই চাওয়া থেকেই দেশে ফিরে আসার জন্য মনস্থির করি। তারপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েটে) প্রভাষক পদে আবেদন করি। আল্লাহর দোয়ায় আমাকে সেখানে নিয়োগ প্রদান করা হয়। আমি গত ২ মে বুয়েটে জয়েন করেছি। সকলের কাছে দোয়া চাই যেন যে আশা- আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশে এসেছি তা পূরণ করতে পারি। যতটুকুই মেধা, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা বা সামর্থ আছে তা দিয়ে যেন দেশের সেবা করতে পারি।
সাগর মিয়া:আপনার পিএইচডির গবেষণার ক্ষেত্র কী ছিল যদি বলতেন?
ড. জান্নাতুল:আমার পিএইচডি গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল Affordable and low-temperature active automobile exhaust emission control catalyst development করা, যাতে কালো ধোঁয়া মুক্ত একটি সুন্দর পৃথিবী গড়তে পারি। এই কাজটি করার সময় ভাবতাম কোনো একদিন ফার্স্ট জেনারেশন ক্যাটালিস্টটি যখন মানুষের কাজে আসবে তখন আমার মনে হবে আমিও এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পেছনের একজন নিভৃত কারিগর। সেই কাজটিই আমাকে বিস্মিত করে।
জাপানের Research Association of Automotive Internal Combustion Engines (AICE) এই কাজটিকে মূল্যায়ন করে আমাকে এআইসিই অ্যাওয়ার্ড-২০২৪-এর জন্য মনোনীত করেন। সেদিন আমিই একমাত্র বিদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে এই সম্মাননা পাই। টয়োটা, হোন্ডা, সুজুকি, ইয়ামাহা, ভক্সওয়াগেনের মতো অটোমোবাইল কোম্পানির কর্ণধারগণ নিজে থেকে এসে আমার সাথে পরিচিত হচ্ছিলেন, কাজের ইম্প্যাক্ট-অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সেদিন আফসোস হচ্ছিলো এই প্রতিনিধিত্ব যদি জাপানের না হয়ে বাংলাদেশের জন্য করতে পারতাম। সেদিন আমার পিএইচডি সুপারভাইজার আমাকে বলেছিলেন ‘আমার এই সুদীর্ঘ কর্মজীবনে এই প্রথম আমার ল্যাব থেকে কেউ প্রেসিডেন্ট ও এআইসিই অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত হলো।
সাগর মিয়া: আপনার ক্যারিয়ারের এই দীর্ঘ যাত্রায় অনুপ্রেরণা কারা ছিল?
ড. জান্নাতুল:এই দীর্ঘ যাত্রায় মহান আল্লাহ তায়ালার রহমত, আব্বু আম্মুর দোয়া ও ভাই বোনের অনুপ্রেরণা ছিল। বিশেষ করে আমার আম্মুর অনেক কষ্ট ও অবদান ছিল, যার ফলে আমি আজকে ড. জান্নাতুল। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দেশের বিদেশের শিক্ষকদের অবদান রয়েছে। বিশেষ করে শাবিপ্রবির অধ্যাপক আবুল হাসনাত স্যার, কুমামোতো ইউভার্সিটির অধ্যাপক মাসাতো মাচিদা- উনাদের কাছে আমি চিরঋণী। সিনিয়র-জুনিয়র, কলিগ, বন্ধু, আত্মীয়, শুভাকাঙ্ক্ষী যারাই এ যাত্রায় পাশে ছিলেন তাদের সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আর একজন মানুষের কথা বিশেষ করে বলতে হয়। আমার এই দীর্ঘ যাত্রা যার সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া প্রায় অসম্ভব ছিল। যিনি আমাকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন ও সহযোগিতা করে অনুপ্রাণিত করে গিয়েছেন। তিনি হলেন আমার স্বামী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক।
সাগর মিয়া:নতুনদের জন্য আপনি কী বার্তা দিতে চান?
ড. জান্নাতুল:নতুনদের মধ্যে যারা শিক্ষক বা গবেষক হতে চায়, তাদের নিজের প্রতি, কাজের প্রতি, সহকর্মী ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্বশীল, যত্নশীল ও সততার পরিচয় দিতে হবে। নিজের ওপর আস্থা রেখে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যেতে হবে। কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটি আর্টিকেলের দিকে নজর দিতে হবে। সর্বোপরি শুধু সফলতার পেছনে না ছুটে প্রতিনিয়ত নিজেকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। আন্তরিকতা ও সততা থাকলে সাফল্য একসময় আসবেই।
সাগর মিয়া:ধন্যবাদ আপনাকে।
ড. জান্নাতুল:আপনাকেও ধন্যবাদ।