জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সুতার মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে সামগ্রিক উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানা কার্যাদেশ বাতিল, লোকসান, শ্রমিক ছাঁটাই এবং বেতন পরিশোধে বিলম্বের ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর ফলে শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। শ্রমিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক মহল সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র, শ্রম ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা ৮০-৮৫ লাখ টন। দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার টন। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদাই ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার টন, যা মোট চাহিদার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। এছাড়া দৈনিক চাহিদা পেট্রোল ও অকটেন মিলিয়ে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টন এবং ফার্নেস অয়েলের প্রায় তিন হাজার থেকে চার হাজার টন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে দেশের সব খাতেই চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের সরবরাহে সংকট রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অপরিশোধিত তেল আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে গত ১৩ এপ্রিল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ২০-২৫ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে।
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তুলা ও সুতার মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। সে তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা তুলার দাম বাড়ায় দেশীয় বাজারে সুতার দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পলিয়েস্টার ফিলামেন্ট সুতার দাম প্রায় ৭৯ শতাংশ এবং সাধারণ কটন সুতার দাম প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর বাজারে প্রতি পাউন্ড সুতায় ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।
জানা গেছে, স্পিনিং মিলে সুতা উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল তুলা সম্পূর্ণরূপে আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি দেশের সুতা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে ৫২৭টি বস্ত্রকলের মধ্যে ৪৭৭টি সচল থাকলেও জ্বালানি সংকট ও কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে তারা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না।
গোয়েন্দা সংস্থাটি প্রতিবেদনে একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। তারা বলেছে, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় জেনারেটর ও বয়লার সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সুতার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় গার্মেন্টস পণ্যের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সামগ্রিক উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পূর্বনির্ধারিত চুক্তিমূল্যে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং অনেক কারখানা লোকসানের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানাগুলো নগদ অর্থ ও পুঁজির সংকটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগামী দিনে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে শ্রমিক ছাঁটাই, বেতন প্রদানে বিলম্ব এবং শ্রমিক অসন্তোষ বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক মহল দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সরকারকে অস্থির করে তুলতে পারে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়া এবং রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড বহনকারী জাহাজ নিরাপত্তাজনিত কারণে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে না পারায় জ্বালানি সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সীমিত আকারে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চালু, অনলাইন সভা বৃদ্ধি, বিকল্প দিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস পরিচালনা, রাত ৮টার পর বিলবোর্ড ও ডিজিটাল ডিসপ্লে বন্ধ রাখা, যানবাহনে জোড়-বিজোড় পদ্ধতি চালু, ফুয়েল পাস অ্যাপস চালু, পুরোনো ও বেশি জ্বালানি খরচকারী গাড়ির চলাচল সীমিত করা এবং গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া।
এছাড়া শিল্পকারখানা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) দ্রুত চালু করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।