Image description
সংসার মানেই শুধু ভালোবাসা নয়, সঙ্গে থাকে মান-অভিমান, দায়িত্ববোধ, হিসাব-নিকাশ আর প্রতিদিনের ছোট ছোট ঝগড়াঝাঁটিও। বিয়ের পর শুরুর দিকে থাকে দুজন দুজনকে কাছে পাওয়ার অবারিত টান। কিন্তু মজার বিষয় হলো- কয়েক বছর যেতে না যেতেই স্ত্রী দু-এক দিনের জন্য বাবার বাড়ি যেতে স্বামী যে খুশিকে আত্মহারা। অনেক স্বামীই মুখে যতই বলুক না কেন ‘যেও না’, মনে মনে কিন্তু ঠিকই খুশি হয়। এর কারণ কী? তাহলে কি স্বামী একা থাকতে পছন্দ করেন নাকি দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার ফলে বোরিং লাগে নাকি অন্যরকম কোনো অস্বস্তি কাজ করে? এটা কি ভালোবাসা কমে যাওয়ার লক্ষণ? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো মানসিক কারণ?
 
আসলে বিষয়টা অনেকটাই মানুষের ব্যক্তিগত স্পেস, অভ্যাস আর মানসিক চাপের সঙ্গে জড়িত। আর তাই স্ত্রী বাবার বাড়ি গেলে স্বামীরা হঠাৎ করেই খুশি খুশি মুডে চলে যান।
 
একটু স্বাধীনতার স্বাদ
সংসারে একজন মানুষ যতই প্রিয় হোক, প্রতিদিন একই রুটিনের মধ্যে থাকতে থাকতে অনেকেরই ব্যক্তিগত সময়ের অভাব হয়। স্ত্রী বাড়িতে থাকলে কখন খাবে, কখন ফিরবে, কী আনতে হবে এসব ছোট ছোট দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। স্ত্রী কয়েক দিনের জন্য বাবার বাড়ি গেলে হঠাৎ করেই স্বামী যেন নিজের পুরনো ব্যাচেলর জীবনের একটু স্বাদ পেয়ে যান। রাত জেগে খেলা দেখা, বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে থাকা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া এসব ছোট স্বাধীনতা তখন বেশ উপভোগ্য মনে হয়।
 
অনেক সংসারেই স্ত্রীরা স্বামীর খাওয়া-দাওয়া, স্বাস্থ্য বা খরচ নিয়ে একটু কড়া নজর রাখেন। ‘এত রাত জাগো কেন?’,‘আবার বাইরের খাবার?’,‘তোয়ালেটা জায়গা মতো রাখো!’ এসব কথা প্রতিদিন শুনতে শুনতে অনেক স্বামী বিরক্ত হলেও, স্ত্রী না থাকলে কয়েকদিন পরই সেই বকুনিগুলো অদ্ভুতভাবে মিস করতে শুরু করেন। তবে প্রথম দু-একদিন আজ কেউ বকবে না—এই অনুভূতিটা বেশ উপভোগ করেন তারা।
 
বন্ধুদের সঙ্গে ফ্রি লাইফ
স্ত্রী বাসায় থাকলে অনেকেই বন্ধুদের সময় কম দিতে পারেন। কিন্তু স্ত্রী বাবার বাড়ি গেলেই যেন বন্ধুমহলে ঘোষণা চলে যায় ‘দোস্ত, আজ রাত ফ্রি!’, তখন চা খাওয়া, আড্ডা দেওয়া, গেম খেলা সবকিছুতেই বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখা যায়। যেন কিছুদিনের জন্য দায়িত্বের চাপ একটু হালকা হয়ে গেছে।
 
কিন্তু এই খুশি বেশিদিন থাকে না
মজার ব্যাপার হলো, প্রথম দিকে যে স্বামী স্বাধীনতায় আনন্দ পান, তিনিই কয়েকদিন পর বুঝতে পারেন বাসাটা কেমন নিঃশব্দ হয়ে গেছে, খাবার টেবিলে কেউ ডাকছে না, রুমটা অদ্ভুত এলোমেলো, রাতে গল্প করার মানুষ নেই, মোবাইলে খেয়েছো বলে কোনো মেসেজও আসে না। তখন হঠাৎ করেই স্ত্রীর ছোট ছোট বিরক্তিকর অভ্যাসগুলোও প্রিয় মনে হতে শুরু করে।
 
এ ব্যাপারে এস. এম. নিষাদ হাসান বলেন, ‘বউ বাসায় না থাকলে বন্ধুদের নিয়ে সারারাত আড্ডা দেই আর বাইরে বাইরে ঘুরতে পারি। তখন ঘরে ফেরার তাড়া দেয়ার কেউ থাকে না। তাই নিজেকে মুক্ত মনে হয়। তবে বেশিদিন না থাকলে আবার মিস করি।’
 
সোহাগ আশরাফ নামে এক বিবাহিত পুরুষ বলেন, ‘দীর্ঘদিন একসঙ্গে সংসার করছি, আর কত? বউকে কতদিন ধরে বলছি- একটু বাবার বাড়ি যাও, যায় না। সে বলে- আমি বাবার বাড়ি গেলে, তোমার আড্ডা দেয়া জমবে, সেটা হবে না। আমি একা একা বাচ্চা সামলাবো আর তুমি আড্ডা মারবা, তা হবে না।’
 
স্ত্রী আপনাকে সন্দেহ করে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটাও একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো না। সন্দেহ তো করেই। দেশের প্রায় সব স্ত্রীই তার স্বামীকে সন্দেহ করে। আমিও সে তালিকায় আছি। আমার মনে হয়, সেই সন্দেহের জায়গা থেকেও হয়তো বাবার বাড়ি অনেক স্ত্রীই যেতে চায় না।’
 
স্ত্রী বাবার বাড়ি গেলে স্বামী খুশি হয় কি না এমন প্রশ্নে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিবাহিত পুরুষ হেসে দিয়ে বলেন, ‘বিয়ের অনেক বছর হয়ে গেলে সংসারটা কারাগার মনে হয়। তাই মাঝে মাঝে বউ বাবার বাড়ি গেলে নিজেকে স্বাধীন মনে হয়। নিজেকে সিঙ্গেল ভেবে একটু শান্তিও লাগে। নিজের মতো করে থাকা যায়। ভেজা তোয়ালে রাখা নিয়ে কেউ বকাঝকা করে না, বাজার আনা নিয়ে কেউ খবরদারি করে না। তবে ঘরে ফিরে ফাঁকা ফাঁকা লাগে। বহুদিনের অভ্যাস তো একসঙ্গে থেকে, তাই স্ত্রীর না থাকার শূন্যতা টের পাই আমি।’
 
তবে যেভাবেই আমরা বলি না কেন, এটা সত্য যে- সাময়িক দূরত্ব বুঝিয়ে দেয় একজন মানুষ জীবনে কতটা জায়গা জুড়ে আছে। তাই অনেক স্ত্রী বাবার বাড়ি গেলে প্রথমে স্বামী খানিকটা খুশি হলেও, দিন শেষে সেই মানুষটার অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন। কারণ সংসারের সবচেয়ে বড় অভ্যাস হয়ে যায় একজন মানুষ, যাকে ছাড়া ঘর ফাঁকা লাগে। তাই স্বাধীনতার আনন্দও হার মানে একটা পরিচিত কণ্ঠের কাছে, ‘শোনো, আমি কাল বাসায় ফিরছি।’