বর্ষা মৌসুম শুরু হতে এখনও কিছুটা সময় বাকি। এরইমধ্যে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। ঠিক এমন সময়েই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সড়কে শুরু হয়েছে ব্যাপক কাটাকাটি, খোঁড়াখুঁড়ি ও সংস্কার কাজ। একদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের কজে সড়ক খোঁড়া হচ্ছে অন্যদিকে একই স্থানে বারবার ভিন্ন সংস্থার কাজের কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করছে। যানজট, ধুলাবালি, ভাঙাচোরা রাস্তা, পানির জমাট সব মিলিয়ে রাজধানীর বাসিন্দাদের দৈনন্দিন অসহনীয় সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। রাজধানীতে সড়ক ও ইউটিলিটি সেবা পরিচালনায় একাধিক সংস্থা কাজ করে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, গ্যাস কোম্পানি, বিদ্যুৎ বিভাগসহ আরো অনেকে। কিন্তু তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সড়ক খোঁড়ার দৃশ্য এখন সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও পানির লাইন সংস্কার, কোথাও গ্যাস লাইনের কাজ, আবার কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রতিটি প্রকল্পই আলাদাভাবে প্রয়োজনীয় হলেও কাজগুলোর সময়সূচি ও বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব প্রকট। ঢাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা যানজট, আর এই সড়ক কাটাকাটি সেই সমস্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর এক বা একাধিক লেন বন্ধ থাকায় যানবাহনের গতি মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষার আগে সড়ক সংস্কার কাজ শেষ করা জরুরি। কিন্তু কাজ শুরু হয় ঠিক বর্ষার আগ মুহূর্তে। বর্ষা শুরু হলে এই খোঁড়াখুঁড়ি করা সড়কগুলো আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠে। খোলা গর্তে পানি জমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে পাশাপাশি পানিবদ্ধতার সমস্যা তীব্র হয়। সমস্যার মূল সমাধান হলো সমন্বিত পরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারি। একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেসের মাধ্যমে কোন সংস্থা কোথায় কাজ করবে তা নির্ধারণ করা গেলে পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব। কাজ শেষ হওয়ার পর দ্রুত সড়ক মেরামত এবং মানসম্মত পুননির্মাণের নিশ্চিত করাও জরুরি। ঠিকাদারদের জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং সময়সীমা নির্ধারণ করে কাজ সম্পন্ন করার উপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
সেগুনবাগিচা, শান্তিনগর ও কাকরাইলসহ বেশকিছু এলাকায় সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। অনেক এলাকায় সড়ক খোঁড়ে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। সেগুনবাগিচা এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, শিল্পকলা একাডেমীর পাশের সড়কে আবারো খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। ঢাকার সড়কে একবার ওয়াসা এসে সড়ক কাটে, পরে গ্যাসের লোক আসে, বিদ্যুতের লোক আসে, তারপর আবার অন্য সংস্থা, এভাবেই চলছে কাজ। আগে পরিকল্পনা করে একসাথে কাজ করলে সমস্যা এতো সমস্যা হতো না। প্রতিদিন অফিসে যেতে দেরি হয়, ধুলায় অসুস্থ হয়ে পড়ছি। উন্নয়ন চাই, কিন্তু এইভাবে নয়। বৃষ্টি হলে পানিবদ্ধতা তো আছেই।
কাকরাইল এলাকায় কথা হয় হাসপাতালে রোগী দেখতে আসা কাশেম মোল্লার সাথে। তিনি বলেন, হাসপাতালে রোগী দেখতে আসতে যেখানে ৩০ মিনিট লাগার কথা সেখানে এখন এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। রাজধানী ঢাকার সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি নতুন কোনো সমস্যা নয় তবে বর্ষার আগ মুহূর্তে কাটাকাটির কারণে নাগরিক জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। উন্নয়ন কাজ অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু নাগরিকদের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. আদিল মুহাম্মদ খান ইনকিলাবকে বলেন, রাজধানী ঢাকার সড়কে বর্ষা মৌসুম আসার আগেই খোঁড়াখুঁড়ি ও কাটাকাটির যে প্রবণতা দেখা যায় তা নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যা। এটি কেবল অব্যবস্থাপনা নয় পরিকল্পনারও অভাব, সমন্বয়ের ঘাটতি। ঢাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো সাধারণত বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিযোগাযোগ এবং সড়ক উন্নয়ন প্রতিটি খাত আলাদা সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। কিন্তু এসব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় প্রায়ই দেখা যায় একটি সংস্থা সড়ক সংস্কারের কাজ শেষ করার কিছুদিন পরই অন্য সংস্থা সেই একই সড়ক আবার খুঁড়ে ফেলে। বর্ষার আগে এ ধরনের কার্যক্রম আরো বাড়ে। কিন্তু এই তাড়াহুড়ো পরিকল্পনার অভাবকে আরো প্রকট করে তোলে। বর্ষার আগে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি না করে বরং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গঠন করা উচিত যা সব ইউটিলিটি সংস্থার কাজ সমন্বয় করবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।