Image description

সৌদি আরবের শ্রমবাজার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বৈধ কাগজপত্র-এমনকি আকামা (ইকামা) থাকার পরও কর্মীদের পুলিশি হয়রানি ও গ্রেফতারের অভিযোগ সামনে আসছে। কাজের অনিশ্চয়তা, আইনি জটিলতা এবং প্রশাসনিক কড়াকড়ির কারণে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী চরম দুর্ভোগের মুখে পড়ছেন।

সম্প্রতি সৌদি আরবের ‘সফর জেল’ থেকে দেশে ফেরত আসা এক মধ্যবয়সী কর্মী ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, “আকামা থাকার পরও কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কাজ পেলেও পুলিশ হয়রানি করছে। অনেক সময় আকামা থাকা সত্ত্বেও সেটি অকার্যকর বা ভুয়া বলে ধরে নিয়ে গাড়িতে তুলে সফর জেলে পাঠানো হচ্ছে।’

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ এক সপ্তাহ, কেউ ১৫ দিন জেল খেটে দেশে ফেরার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে অনেকে মাসের পর মাস আটক থেকেও দেশে ফেরার সিরিয়াল পাচ্ছেন না। ‘অনেকে শুধু জেলে বসে কাঁদছে। পরিবার-পরিজনের সাথে যোগাযোগও সীমিত,”- যোগ করেন তিনি।

এই অভিযোগ যে বিচ্ছিন্ন নয়, তা বোঝা যাচ্ছে নিয়মিত ফেরত আসা কর্মীদের বক্তব্য থেকেও। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন অনেকেই। কেউ বলছেন, রাস্তায় চলাচলের সময় হঠাৎ পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে; কেউ আবার অভিযোগ করছেন, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অসাধু চক্র অর্থ আদায়ের জন্য বিদেশী শ্রমিকদের হয়রানি করছে।

ওই প্রবাসী কর্মী আরো জানান, “আমাকে রাস্তায় যাওয়ার সময় থামিয়ে আকামা দেখতে চায়। আমি দেখানোর পরও পাশের কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে একটি মসজিদে নিয়ে গিয়ে ছবি তুলে আমার বিরুদ্ধে ভিক্ষাবৃত্তির মামলা দিয়ে সফর জেলে পাঠানো হয়। আমি সেখানে ১৮ দিন ছিলাম।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, “যারা সৌদি আরবে যেতে চান, তারা ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে যাবেন। এখন সেখানে কাজের সঙ্কট তীব্র। আকামা পেলেও কাজ নেই, আর কাজ পেলেও নিরাপত্তা নেই।”

তবে এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন অভিবাসন বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান। তিনি বলেন, ‘আকামা থাকার পরও পুলিশ ধরে জেলে পাঠাচ্ছে-এমন বিষয় আমার জানা নেই। তবে যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে অবশ্যই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদিতে বাংলাদেশের মিশনকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক পরিসরে নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মীর কাগজপত্র বৈধ ছিল কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন। দূতাবাস তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে এবং ভুল বোঝাবুঝিও কমবে।’

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকই এই দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি সরকারের কঠোর নীতির কারণে কর্মী পাঠানোর হার কমে গেছে।

বিশেষ করে ‘তাকামল সার্টিফিকেট’ বাধ্যতামূলক করার পর নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই সার্টিফিকেটের মাধ্যমে কর্মীর দক্ষতা যাচাই করা হলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে বেতন বা কাজের নিশ্চয়তা বাড়ছে না।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি চার-পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’র নামে কর্মী পাঠাচ্ছে। এই ভিসাগুলো সাধারণত স্বল্পমেয়াদি (প্রায় তিন মাস) হওয়ায় মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কর্মীরা অবৈধ হয়ে পড়ছেন। তখন তারা বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ছেন এবং শেষ পর্যন্ত জেলে যাচ্ছেন।

বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব থেকে খালি হাতে ফেরত আসা কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক।

এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল শ্রমিক পাঠানো নয়-তাদের সুরক্ষা, আইনি সহায়তা এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব নিশ্চয়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। বায়রা নেতার ভাষায়- ‘ঘটনার সত্যতা যাই হোক, দূতাবাসের উচিত প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাওয়া।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, ‘তাকামল সার্টিফিকেট নিতে কর্মীদের প্রায় ৫০ ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। অথচ সেই অনুযায়ী বেতন বাড়ছে না। এই বিষয়টিও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তোলা প্রয়োজন।’

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের শ্রমবাজারে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা ও অভিযোগগুলো বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ- যাতে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারও স্থিতিশীল থাকে।