Image description

স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি হলেও, চিকিৎসা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবার মোট খরচের ৭৯ শতাংশই রোগীদের নিজস্ব পকেট থেকে (আউট-অফ-পকেট) মেটাতে হচ্ছে।

 

অতিরিক্ত এই খরচের কারণে দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা চাহিদা অপূরণীয় থেকে যাচ্ছে, যার সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলো।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

 

সর্বশেষ 'খানা আয় ও ব্যয় জরিপ (এইচআইইএস) ২০২২'-এর ৬২,৩৮৭ জন ব্যক্তি ও ১৪,৪০০টি পরিবারের তথ্যের ভিত্তিতে বিআইডিএস এই গবেষণাটি পরিচালনা করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ২২ শতাংশ মানুষের প্রতি মাসে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয়।

কিন্তু অর্থাভাব বা অন্যান্য কারণে এই চাহিদার ৬৫ শতাংশই অপূরণীয় থেকে যায়। এর মধ্যে শহরের মানুষের তুলনায় গ্রামের মানুষের  চিকিৎসা বঞ্চিত থাকার হার অনেক বেশি।
শহরের মানুষের চিকিৎসা বঞ্চিত থাকার হার ৫৯ শতাংশ এবং গ্রামের মানুষের চিকিৎসা বঞ্চিত থাকার হার ৬৮ শতাংশ। 

 

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে চরম বৈষম্যের চিত্র। নড়াইল ও হবিগঞ্জ জেলায় যথাক্রমে ৮১ শতাংশ ও ৮০ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা অপূরণীয় থেকে যাচ্ছে, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ফেনী জেলা, যেখানে অপূরণীয় চাহিদার হার মাত্র ১৮ শতাংশ।

বিআইডিএস-এর তথ্যমতে, দেশে পরিবার প্রতি মাসে গড়ে তিন হাজার ৪৫৪ টাকা শুধু স্বাস্থ্যসেবার পেছনে ব্যয় করে, যা তাদের মোট পারিবারিক ব্যয়ের ১১ শতাংশ। এই খরচের সবচেয়ে বড় অংশটি চলে যায় ওষুধ কেনা এবং রোগ নির্ণয়ের (ডায়াগনস্টিক) পেছনে। নিজস্ব পকেট থেকে এই বিপুল পরিমাণ ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে।

গবেষণায় চিকিৎসা সেবায় চরম বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, সরকারি হাসপাতালগুলোতে সবার সমান প্রবেশাধিকার থাকলেও বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সেবা মূলত ধনীক শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে খারাপ তথ্য হলো আর্থিক চাপের অসমতা। টাকার অঙ্কে ধনীরা চিকিৎসার পেছনে বেশি খরচ করলেও, আয়ের তুলনায় দরিদ্রদের ওপর এই চাপ অমানবিক। সবচেয়ে ধনীক শ্রেণির আয়ের মাত্র ৫ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় হয়, যেখানে দরিদ্র একটি পরিবারের আয়ের ৩৫ শতাংশই চলে যায় চিকিৎসা খাতে। গবেষকরা বাংলাদেশের বর্তমান এই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে একটি 'পশ্চাদগামী' ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এই গবেষণায় দেশের চিকিৎসার করুণ অবস্থা উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের একটি বড় অংশের মানুষ এখনও চিকিৎসাবঞ্চিত এবং দরিদ্রদের ওপর খরচের বোঝা সবচেয়ে বেশি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজস্ব পকেট থেকে খরচের এই নির্ভরতা কমিয়ে আনতে অবিলম্বে সামাজিক স্বাস্থ্য বিমার মতো 'ঝুঁকি-বণ্টন ভিত্তিক' অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জোর সুপারিশ করেছে বিআইডিএস।