জাতীয় সংসদে একজোট হিসেবে থাকলেও আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দাঁড়াতে পারে মুখোমুখি। যার আভাস মিলছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) মেয়র পদে দুই দলেরই অনানুষ্ঠানিক প্রার্থিতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে। এরই মধ্যে জামায়াত ডিএসসিসির মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েমের নাম প্রস্তাব করেছে।
অন্যদিকে এনসিপি এই পদের জন্য ঘোষণা করেছে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম। যদি দু-দলই নিজেদের অবস্থানে অটল থাকে, তাহলে ভোটের মাঠে তাদের নামতে হবে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই এনসিপি আর জামায়াত-শিবিরকে একসঙ্গে চলতে দেখা গেছে। এনসিপির নেতারা বিভিন্ন সময়ে নানা বক্তব্যে এটাও জানিয়েছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তাদের সহযোদ্ধা ছিলেন জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। এমনকি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা আলোচনা-সমালোচনার পরও জামায়াতের সঙ্গেই জোট করে এনসিপি, যার প্রতিবাদে একাধিক নেতা দল ত্যাগ করেন। তবু জামায়াতকে ছাড়েনি এনসিপি।
সিটি নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার আলোচনা এখনো নেই। জামায়াত ১২ সিটিতেই প্রার্থী দেবে। এক্ষেত্রে জনপ্রিয় ও তরুণ প্রার্থীদের সামনে আনার পরিকল্পনা চলছে। ঢাকা দক্ষিণে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমই প্রার্থী হবেন। এ ছাড়া শিবিরের সাবেক একাধিক সভাপতিকেও মেয়র প্রার্থী তালিকায় দেখা যেতে পারে
এখন সিটি নির্বাচন ঘিরে দুই দলের মধ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে চলছে হিসাবনিকাশ। জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই পরিস্থিতি।
জামায়াত ও এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণ দুই দলের কাছেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শক্ত অবস্থান জানান দিতেই এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় দল দুটি।
এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটিসহ পাঁচ সিটিতে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। অন্যদিকে জামায়াত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিটিতে প্রার্থী ঘোষণা না করলেও জানা গেছে, ১২টিতেই তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী অনেকটাই চূড়ান্ত।
বিষয়টি নিয়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের মধ্যে প্রাথমিক কিছু আলোচনাও হয়েছে। তবে জোটগত নির্বাচনের বিষয়ে আসেনি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ডিএসসিসি। গত শুক্রবার ঢাকার কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে আয়োজিত এক সম্মেলনে এই সিটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েমের নাম প্রস্তাব করা হয়। আর এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় আলোচনা। কেননা এর আগেই আসিফ মাহমুদকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে এনসিপি।
সাদিক কায়েম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের আন্তর্জাতিক সম্পাদক। অন্যদিকে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ এনসিপির মুখপাত্র।
জামায়াত যদিও বলছে, সাদিক কায়েমের নামটি এখনো চূড়ান্ত নয়। নাম চূড়ান্ত হলে ঘোষণা দিয়ে তা জানানো হবে।
অন্যদিকে এ ঘটনায় নতুন মোড় দিয়েছে খোদ সাদিকের সংগঠন ছাত্রশিবির। সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এসএম ফরহাদের সই করা এক জরুরি ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘শিবিরের দায়িত্বে বহাল থাকা অবস্থায় কেউ অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে বা প্রার্থী হতে পারবেন না। এমনকি কোনো রাজনৈতিক দল থেকেও তাকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেই।’
ফলে এখন অপেক্ষা শিবিরের ষাণ্মাসিক সম্মেলনের। জানা যাচ্ছে, দুই মাস পরের ওই সম্মেলনে দায়িত্ব ছাড়বেন সাদিক কায়েম। ডাকসুরও মেয়াদ শেষ হচ্ছে সেপ্টেম্বরে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি যোগ দেবেন জামায়াতে। আর তখনই তাকে প্রার্থী হিসেবে দেওয়া হবে ঘোষণা।
এই ছাত্রনেতার প্রতি জামায়াতের আগ্রহের কারণ তার জনপ্রিয়তা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পেরিয়ে আসা দেশের রাজনীতিতে তরুণ মুখ সামনে আনতে চায় দলটি, বলছিলেন দলের এক নেতা, যার মাধ্যমে জামায়াত দিতে চায় নতুন রাজনৈতিক বার্তাও। পাশাপাশি এনসিপিও তরুণদেরই দল, যদি দল দুটি মুখোমুখি দাঁড়ায়, তবে লড়াইটা হবে তরুণদের মধ্যেই।
জামায়াতের দায়িত্বশীল এক নেতা আগামীর সময়কে বললেন, ‘সিটি নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার আলোচনা এখনো নেই। জামায়াত ১২ সিটিতেই প্রার্থী দেবে। এক্ষেত্রে জনপ্রিয় ও তরুণ প্রার্থীদের সামনে আনার পরিকল্পনা চলছে। ঢাকা দক্ষিণে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমই প্রার্থী হবেন। এ ছাড়া শিবিরের সাবেক একাধিক সভাপতিকেও মেয়র প্রার্থী তালিকায় দেখা যেতে পারে।’
এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হচ্ছে আমরা এককভাবে এই লড়াইয়ের দিকে যাব। যদি শেষ সময়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন আমরা সবার সঙ্গে বসে বৃহত্তর স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেব
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে শুধু জনপ্রতিনিধি বাছাই নয়, বরং নিজেদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা যাচাইয়ের লিটমাস টেস্ট হিসেবে দেখছে এনসিপি। এরই মধ্যে ডিএসসিসিতে আসিফ মাহমুদ এবং ডিএনসিসিতে আরিফুল ইসলাম আদীবকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। চলছে অন্য সিটিগুলোর জন্য সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজে অংশ না নিয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন আসিফ। তখন থেকেই আলোচনায় ছিল, ঢাকা সিটি নির্বাচনে তাকে করা হতে পারে প্রার্থী। নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছেন সাবেক এই উপদেষ্টা।
অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংগঠনিক ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে। সবশেষ শনিবার (২ মে) নিজের ফেসবুক পাতা থেকে ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে ঢাকা দক্ষিণের বাসিন্দাদের আর ময়লার বিল দিতে হবে না।
এনসিপির একাধিক নেতা আগামীর সময়কে বলেছেন, তারা জোটগতভাবে সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। তবে সেক্ষেত্রে ঢাকার অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিটিসহ কয়েকটিতে ছাড় দিতে হবে জামায়াতকে। বিশেষ করে, দক্ষিণে আসিফের সঙ্গে কোনো আপসই করবেন না তারা।
তবে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সালেহ উদ্দিন সিফাত আগামীর সময়কে বললেন, ‘আপাতত জোটগত নির্বাচনের কোনো আলোচনা নেই। আমাদের প্রার্থীরা নিজেদের মতো করে কাজ করছেন। পরে জোটগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
একই সুরে কথা বলেছেন এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম। তার ভাষ্য, ‘এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হচ্ছে আমরা এককভাবে এই লড়াইয়ের দিকে যাব। যদি শেষ সময়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন আমরা সবার সঙ্গে বসে বৃহত্তর স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেব। আশা করছি, আমাদের সাংগঠনিক বোঝাপড়ায় কোনো সমস্যা হবে না।’
জামায়াতও এককভাবে নির্বাচনের পক্ষে বলে জানালেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
তিনি বললেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনগুলো নিজ নিজ দল থেকে করা হবে। এভাবেই আলোচনায় বলা হয়েছে। মেয়র প্রার্থী আমরা কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেব।’
কথায় আছে, রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। তাই শেষ পর্যন্ত জোটবন্ধু হয়ে নাকি প্রতিপক্ষ হয়ে জামায়াত-এনসিপি মাঠে নামবে, তা বলে দেবে সময়ই।