Image description

রাজধানীর মগবাজারের মধুবাগ এলাকায় সকাল গড়াতেই শুরু হয় নগর জীবনের ব্যস্ততা। গৃহকর্মীদের আনাগোনা, রিকশার বেলের শব্দ, গলিপথে শিশুদের দৌড়ঝাঁপ– সব মিলিয়ে চেনা ছবি। তবে এই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব উদ্বেগ– হাম রোগ ও এর টিকা নিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের অজ্ঞতা ও তথ্য বঞ্চনা।

তিন বছর ধরে মধুবাগের এক বাসায় কাজ করেন ফয়জুলা বেগম। গত সপ্তাহে তাঁর দুই বছর বয়সী সন্তানের জ্বর হয়। প্রথমে তিনি এটিকে সাধারণ জ্বর ভেবেই এড়িয়ে যান। কয়েক দিন পরও জ্বর না কমলে যে বাসায় কাজ করেন, সেখানকার গৃহকর্ত্রীর কাছ থেকে হামের কথা শুনে চিকিৎসকের কাছে যান। সেখানেই প্রথম জানতে পারেন, এটি হামের লক্ষণ। তিনি বলেন, ‘আমরা বাসায় কাজ করি। এসব রোগ-টিকার কথা কেউ বলে না।’

একই এলাকায় কাজ করা রেহানা বলেন, ‘আমার তিন বছরের মেয়ের এখনও হামের টিকা দেওয়া হয়নি। কোথায়, কবে টিকা দেয়— আমরা জানিই না।’ শিউলি ও আসমাও একই কথা জানান। দিনভর কাজের চাপে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছেন। তবে ভিন্ন চিত্রও আছে। রিকশাচালক আলমগীর ও রবিউল যাত্রীদের কাছ থেকে হামের খবর শুনে নিজ উদ্যোগে সন্তানকে টিকা দিয়েছেন। আলমগীর বলেন, যাত্রীরা না বললে আমরা জানতামই না।
মধুবাগ, হাতিরঝিল ও বেইলি রোডসংলগ্ন এলাকায় থাকা পথশিশুরা আরও বেশি ঝুঁকিতে। ৯ বছরের রুবেল জানায়, জ্বর হলে দোকান থেকে ওষুধ নেয়। টিকা কী— জানে না সে। তাদের কেউ কখনও টিকা নেয়নি, আবার কেউ নেওয়ার সুযোগও পায়নি। অভিভাবকহীন এসব শিশু স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি।

বস্তিতে টিকাদান কম, সংক্রমণ বেশি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় হামের উচ্চঝুঁকি রয়েছে। ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে তুলনামূলক বেশি। তবে এসব এলাকায় টিকাদানের হার অন্য এলাকার চেয়ে কম।

এদিকে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের দুটি কেন্দ্রে হামের টিকাদান কার্যক্রম জোরদার রয়েছে। নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ শিশু টিকা নিতে আসছে। কেন্দ্রটির তত্ত্বাবধায়ক আফরোজা আক্তার বলেন, হামের টিকার বিষয়ে শিশু ও অভিভাবকদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। অভিভাবকরা নিজ উদ্যোগে টিকা নিচ্ছেন। 

তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়, টেকেরবাড়ি বস্তি, মিরপুর-১২ ও লালাসরাই বস্তিতে। এসব এলাকায় দুটি টিকাদান কেন্দ্র থাকলেও প্রতিদিন মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ শিশু টিকা নিতে আসে। কেন্দ্র দুটির তত্ত্বাবধায়ক রাসেল রানা বলেন, অনেক অভিভাবক টিকা নিতে আসেন না। টিকা নিয়ে তাদের মধ্যে কুসংস্কার রয়েছে। কেউ কেউ করোনার টিকা নিয়ে জটিলতার কথা বলে ভয় পান। আমরা ঘরে গিয়ে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করছি, যাতে একটি শিশুও বাদ না পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মাইকিংয়ের সময় তারা কাজে ব্যস্ত থাকেন, আবার অনেকে অসচেতন ও অশিক্ষিত।

মধুবাগ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর মতো দৃশ্যমান উদ্যোগ খুব একটা নেই। না আছে নিয়মিত মাইকিং, না আছে পর্যাপ্ত প্রচারপত্র। ফলে গৃহকর্মী, রিকশাচালক ও পথশিশুর মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথ্য প্রাপ্তির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে।

ঢাকায় হামে আক্রান্ত শিশুর একটি বড় অংশ বস্তিতে থাকে, অনেকেই দেরিতে হাসপাতালে আসে। রাজধানীর কড়াইল বস্তির বাসিন্দা দেড় বছর বয়সী মো. ওসমান সাত দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। অবস্থার অবনতি হলে তাকে মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার মা মুন্নি বেগম বলেন, ‘পাঁচ দিন ধরে জ্বর ছিল, নাপা খেয়েও কমছিল না। পরে চোখ লাল হয়ে যায়, মুখে ঘা হয়, পানি খেতেও পারছিল না। বস্তির ফার্মেসির পরামর্শে হাসপাতালে আনি।’ তিনি জানান, তার সন্তান এখনও হামের  টিকা পায়নি।

গতকাল শনিবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে এখন মূলত হাম বা এই রোগের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীই ভর্তি নেওয়া হচ্ছে। সারা দেশ থেকে পাঠানো রোগীরাও ভর্তি হচ্ছেন। রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ রোগী ঢাকার এবং তাদের বড় অংশ কড়াইল বস্তির বাসিন্দা।

ডিএনসিসি হাসপাতালে গত সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ৪৬৫ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল, যার মধ্যে ৭৬ জন আইসিইউতে। চিকিৎসকরা জানান, ঘনবসতি, অপুষ্টি ও টিকাদানের ঘাটতির কারণে বস্তির শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. আসিফ হায়দার বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিতে শিশুরা একসঙ্গে বসবাস ও খেলাধুলা করে। এতে দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়। অপুষ্টি ও কৃমি সমস্যার সঙ্গে টিকা না নেওয়ার বিষয়টি যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, হাম প্রায় সব শিশুকেই আক্রান্ত করতে পারে। তবে গুরুতর অবস্থায় যাচ্ছে মূলত অপুষ্টিতে ভোগা বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুরা। তিনি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান জোরদার, ভ্রান্ত ধারণা দূর করা এবং গৃহকর্মী, রিকশাচালক ও দিনমজুরদের জন্য সহজ ভাষায় প্রচার বাড়ানোর ওপর জোর দেন। এক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিওনেটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং (সংস্পর্শ অনুসন্ধান) ব্যবস্থা চালু করা দরকার। 
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত ৬১ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় এসেছে। আমাদের লক্ষ্য শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ঘরে ঘরে গিয়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানো হবে। ভ্রাম্যমাণ মানুষকে হামের টিকার আওতায় আনতে  ভ্রাম্যমাণ টিকাকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

সংক্রমণের চিত্র
হামের উপসর্গে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তারা সবই ঢাকার। এ সময়ে সারাদেশে আরও ১ হাজার ২৪ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে, যার মধ্যে ৭২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে ২৩৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৪৯ শিশু। সব মিলিয়ে ২৮৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৩৯ হাজার ৩২৫ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে এবং ২৬ হাজার ৯১১ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে মোট ৫ হাজার ২১৮ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

আলীকদমে আরও এক শিশুর মৃত্যু
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল উপজেলার দুর্গম সিন্ধুমুখপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে ইউনিয়নটিতে হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু হলো। বর্তমানে আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৩ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
গতকাল নিহত শিশুর নাম তাংতুই ম্রো (৮)। সে ইউনিয়নের প্রেন্নয় হোস্টেলের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তাংতুই ম্রো লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ছিল। পরে গত বৃহস্পতিবার তাকে লামা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এরপর বাড়ি ফেরার পথে আবার জ্বর দেখা দিলে সিন্ধুমুখপাড়ায় তার মৃত্যু হয়।

ময়মনসিংহে ২ শিশুর মৃত্যু 
ময়মনসিংহ থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত দেড় মাসে এই হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ২২ শিশুর প্রাণহানি ঘটল।

চুয়াডাঙ্গায় এক শিশুর মৃত্যু
চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা জানান, চুয়াডাঙ্গায় হামের উপসর্গ নিয়ে আমির হামজা নামে আট মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশুটি। সে দামুড়হুদার কুড়লগাছি গ্রামের ইব্রাহিম আলীর ছেলে।