Image description

কলকারখানার রাসায়নিকে ঢাকার বালু নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। এর প্রভাবে নদীর মাছেও মিলছে সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, তামা, আর্সেনিক, নিকেলের মতো ভারী ধাতু। আর এই মাছ খাওয়ার ফলে মানুষের শরীরে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) নতুন গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘হেভি মেটাল কনট্যামিনেশন লেভেল ইন সিলেক্টেড ফিশেস অব দ্য বালু রিভার ইন বাংলাদেশ: হেলথ রিস্ক অ্যাসেসমেন্টস’ শীর্ষক গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বিসিএসআইআরের খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জি এম এম আনোয়ারুল হাসান।

বালু নদীর ফকিরখালী বাজার, বেরাইদ সেতু ও ইসাপুর বাজার থেকে তিনটি মাছের নমুনা সংগ্রহ করেন গবেষক দল। গবেষণার জন্য ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সরপুঁটি, তিতপুঁটি ও বাইম প্রজাতির মাছ নেওয়া হয়। চলতি বছরের শুরুতে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।

গবেষকরা জানিয়েছেন, শিল্প ও কৃষি-বর্জ্য, আবাসিক বর্জ্য পানি ও মানবসৃষ্ট বর্জ্যর সঙ্গে থাকা ধাতুগুলো প্রথমে নদীর পানি ও পলিতে মেশে। পরে তা মাছের শরীরে প্রবেশ করে। ফলে মাছগুলো আকার, আচরণ, শারীরবৃত্তীয় এবং প্রজননগত সমস্যার সম্মুখীন হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পরীক্ষিত প্রতিকেজি মাছের শরীরে সর্বনিম্ন ১ দশমিক ৯৯ থেকে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ২৬ মিলিগ্রাম সিসা, শূন্য দশমিক ০৪ থেকে শূন্য দশমিক ৪৯ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম, শূন্য দশমিক ৪৩ থেকে ৪ দশমিক ২৯ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম ও শূন্য দশমিক ১৫ থেকে ৫ দশমিক ৪৮ মিলিগ্রাম আর্সেনিকের ঘনত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৬ দশমিক ৭৪ থেকে ১২ দশমিক ৬৪ মিলিগ্রাম তামা এবং ১ দশমিক ০৮ থেকে ৩ দশমিক ৭৩ মিলিগ্রাম নিকেলের ঘনত্ব মিলেছে।

গবেষক দলের ভাষ্যে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন এবং ওয়ার্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের তথ্য– এসবের মধ্যে শুধু তামা ও নিকেলের ঘনত্ব অনুমোদিত সীমার নিচে রয়েছে। সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও আর্সেনিকের ঘনত্ব নির্ধারিত মানের সীমা অতিক্রম করেছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।

গবেষক দলের প্রধান আনোয়ারুল হাসান স্ট্রিমকে বলেছেন, গবেষণায় আমরা যে ফলাফল পেয়েছি, তা শঙ্কার বিষয়। ধাতুর দূষণ কমানো, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং বালু নদীর বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। বালু নদীর দূষণের মাত্রা বৈশ্বিকভাবে তুলনা করলে আর্সেনিক ছাড়া সব ধাতুর ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, নদীর কাছাকাছি বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে নদীতে নির্গত বর্জ্য পদার্থ থেকে আসা ধাতু-দূষিত খাদ্য এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট উৎসের কারণেও মাছের শরীরে ধাতুর ঘনত্ব তৈরি করতে পারে। বালু নদীতে ধাতু দূষণ অত্যন্ত বেশি। এই দূষণ অব্যাহত থাকলে নদীটি জলজপ্রাণিদের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে।

ক্যানসারের ঝুঁকি

গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রোটিনের জন্য বাংলাদেশ মাছের ওপর নির্ভরশীল। দেশে গৃহীত প্রাণিজ প্রোটিনের প্রায় ৬০ শতাংশ পাওয়া যায় মাছ থেকে। সেইসঙ্গে দেশের পুষ্টি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মৎস্যশিল্প, যা কৃষি জিডিপিতে ২৪ দশমিক ৪১ এবং সামগ্রিক জিডিপিতে ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ অবদান রাখে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, পলি, পানি, ফুলকা ও ত্বকের মাধ্যমে মাছ বিষাক্ত পদার্থগুলো গ্রহণ করে, যা মাছের শরীরে দীর্ঘস্থায়ী থেকে যায়। এই মাছ খাওয়ার পর অপচনশীল পদার্থগুলো মানব শরীরে স্থানান্তরিত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়। মানুষের শরীরে এসব পদার্থ জমা হতে হতে কোষ ও অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি করে।

ভারী ধাতুর সংস্পর্শে আসার কারণে মিঠাপানির মাছ খাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি বলে জানিয়েছে গবেষক দল। গবেষণায় দেখা গেছে, মাছে রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির দুটি বিভাগ সম্পর্কিত। এর একটি ক্যানসার সৃষ্টিকারী; অন্যটি ক্যানসার সৃষ্টিকারী নয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বালু নদীর মাছের শরীরে পাওয়া ধাতুগুলোর কারণে ক্যানসার ছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্নায়ুতন্ত্রের কর্মহীনতা, কিডনি বিকলতা, জিনগত বিষক্রিয়া, অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া ও রক্তাল্পতা, পাকস্থলী, পরিপাকতন্ত্র এবং শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা হতে পারে।

অন্যদিকে ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক এবং নিকেলের সংস্পর্শে আসা মাছ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। আনোয়ারুল হাসান বলেন, কয়েকবার খেলেই ক্যানসার হয়ে যাবে– বিষয়টা এমন নয়। বরং দীর্ঘদিন এই মাছ খাওয়া হলে ঝুঁকি বাড়বে।

প্রয়োজন সতর্কতা

গবেষণা অনুযায়ী, বালু নদীর বাইম মাছের শরীরে উচ্চ মাত্রার সিসা, আর্সেনিক এবং নিকেল পাওয়া গেছে। তিতপুঁটি মাছে পাওয়া গেছে উচ্চ মাত্রার ক্যাডমিয়াম এবং তামা। আর সরপুঁটিতে বেশি পাওয়া গেছে ক্রোমিয়াম।

আনোয়ারুল হাসান বলেন, শুধু শিল্পবর্জ্য শোধন আর রাসায়নিক সার কম ব্যবহার করলেই হবে না। মাছ, পানি এবং পলিতে ভারী ধাতুর মাত্রা নিরীক্ষণের জন্য রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। সেইসঙ্গে নদী দূষণের ঝুঁকি এবং এর প্রভাব কমানোর বাস্তব পদক্ষেপ সম্পর্কে স্থানীয়দের সচেতনে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।