‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’ই কেবল নয়, ‘সি ভোটার’ ও ‘সিএসডিএস’-এর মতো নামী সংস্থা এবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের বুথফেরত সমীক্ষার ফল প্রকাশ করছে না। কেন এ সিদ্ধান্ত, ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’র কর্ণধারের মতো ‘সি ভোটার’-এর কর্তারাও তার ব্যাখা দিয়েছেন। ‘সিএসডিএস’ অবশ্য নীরব।
অথচ এসব জরিপ প্রতিষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গের ভোট নিয়ে কাজ করেছে। ভোটের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নানান মতও প্রকাশ করেছে। কিন্তু চূড়ান্ত পর্বের পর কোন দল কত আসন পেতে চলেছে, কারা জিতবে কারা হারবে, সেই হিসাব দেয়নি।
বিরোধীরা মনে করছে, এ সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপির চাপ। শাসক দলের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তাদের পক্ষে বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যেই এ অভিযোগ করেছেন। কোনো রকম রাখঢাক না রেখেই তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নির্দেশে এ ধরনের সমীক্ষা করা হয়েছে। বিজেপির জয় দেখানো হচ্ছে। এসব করা হচ্ছে বিরোধীদের মনোবল ভেঙে দিতে।
মমতা আরও বলেছেন, সরকারের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য শেয়ারবাজারের ধস ঠেকানো। দলীয় কর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছেন, সত্যি ফল দেখালে, মানে তৃণমূল কংগ্রেস জিততে চলেছে দেখালে শেয়ারবাজারে ধস নামত। মোদি-শাহ সেটা চাননি। তাই সমীক্ষকদের বলে দেওয়া হয়েছে, বুথফেরত জরিপে যেন বিজেপির জয়ই দেখানো হয়।
এবার যতগুলো সংস্থা বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশ করেছে, তাদের মধ্যে পাঁচটি এগিয়ে রেখেছে বিজেপিকে, দুটি তৃণমূল কংগ্রেসকে।
তৃণমূল নেত্রী গত বৃহস্পতিবারই জোর দিয়ে বলেন, ২০১৬, ২০২১ ও ২০২৪ সালের ভোটেও বিজেপি এই কায়দা করেছিল। সমীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপ দিয়ে বলানো হয়েছিল, বিজেপি জিতছে। ফল কী হয়েছিল, সবার জানা। এবারও তৃণমূল কংগ্রেস ২২৬টি আসন জিতছেই। সেটা ২৩০ আসনও হতে পারে।
প্রতিবারের মতো এবারও ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’ আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, কেরলম, তামিলনাডু ও পদুচেরি বিধানসভা ভোটের বুথফেরত জরিপ প্রকাশ করেছে। ভোটের আগে বিভিন্ন দলের সম্ভাবনা, ভোটের ইস্যু, মানুষের মন, পুরুষ, নারী, জাত ও সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রতিক্রিয়া এবং ভোটের ফলে তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে অভিমত তারা জানিয়েছে।

ভোটের পর বাকি সব রাজ্যের বুথফেরত জরিপের ফলে জয়-পরাজয়ের সম্ভাবনা কার কতটা, তা জানানো হলেও পশ্চিমবঙ্গ বিষয়ে তারা চুপ থাকে। অনেক পরে সংস্থার কর্ণধার প্রদীপ গুপ্ত জানান, পশ্চিমবঙ্গের জরিপ তাঁরা জানাবেন না। কারণ, রাজ্যের ৭০ শতাংশের মতো মানুষ ভোট নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। তাই পর্যাপ্ত নমুনা না পাওয়ায় তাঁরা বুথফেরত সমীক্ষা করেননি।
কেন মানুষ মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেন না, জানতে চাওয়া হলে প্রদীপ গুপ্ত বলেছেন, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ওই রাজ্যে একধরনের ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে। অচেনা লোকজনের কাছে মানুষ তাই মুখ খুলতে নারাজ।
‘সি ভোটার’-এর মতো নামী সংস্থার আচরণও এবার অন্য ধরনের। এই সংস্থার কর্ণধার যশোবন্ত দেশমুখ নির্বাচন চলাকালে প্রায়ই বিভিন্ন টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলে এসেছেন। বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের সমীক্ষার ভিত্তিতে মনোভাব জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও যথেষ্ট সক্রিয় থেকেছেন। অথচ বুথফেরত সমীক্ষায় কোন দল কত আসন পেতে চলেছে, তা জানাননি।
যশোবন্ত দেশমুখ ও সুতনু গুরু এক নিবন্ধে এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তাতে তাঁরা লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কোন দলের ভোট শেয়ার কত হতে চলেছে, এ ধরনের পূর্বাভাস তাঁরা দিয়েছেন। কিন্তু যেহেতু এবার লড়াই খুব হাড্ডাহাড্ডি, তাই কোন দল কত আসন পাবে, সেই ঝুঁকি তাঁরা নিচ্ছেন না।
তা ছাড়া সি ভোটারের কর্তারা বলেছেন, সাম্প্রতিক কালে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন রাজ্যে বুথফেরত সমীক্ষার ফল একেবারেই মিলছে না। ভোটের আগের জনমত সমীক্ষা যে ধারণা দিচ্ছে, ভোটের ফলে তার প্রতিফলন ঘটছে না। উদাহরণ হিসেবে তাঁরা মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, ঝাড়খন্ড, দিল্লি ও বিহারের উল্লেখ করেছেন। এসব রাজ্যে ভোটের ফল বিস্ময়কর।
পশ্চিমবঙ্গ প্রসঙ্গে কর্তারা বলেছেন, রাজ্যে তাঁরা দুটি ভিন্ন ধারা লক্ষ্য করেছেন। যেমন তাঁরা দেখেছেন, প্রবল সরকারবিরোধী মনোভাব রয়েছে অথচ পাশাপাশি আছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে। এ কারণে কারা কত আসন পাচ্ছে, তা জানানো খুব ঝুঁকির কাজ হয়ে যায়।
সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজ বা ‘সিএসডিএস’ সরাসরি বুথফেরত জরিপ না করলেও গণতন্ত্র, সমাজ ও রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজেদের ধ্যানধারণা প্রকাশ করে। ‘সিএসডিএস-লোকনীতি’ নির্বাচনী গতিপ্রকৃতিরও হদিস দেয়। গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে সক্রিয় থাকলেও এবার তারা আশ্চর্যজনকভাবে নীরব।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, এই নীরবতা স্বেচ্ছায় নয়। এটা হলো চাপের রাজনীতির কাছে মাথা না ঝোঁকানো।
নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতায় গণনায় কেউ যাতে কোনো রকম কারসাজি করতে না পারে, সে জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলীয় কর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছেন। গণনা কেন্দ্রে কীভাবে কাজ করতে হবে, কোন কোন বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে, সে বিষয়ে সবাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে আজ শনিবার বিকেলে তাঁরা দলের সব কাউন্টিং এজেন্টের সঙ্গে বৈঠক করছেন। সেই বৈঠক হবে ভার্চ্যুয়াল।
কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি থেকে ওই ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে অংশ নেবেন মমতা ও অভিষেক। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় এ নিয়ে আলোচনার জন্য মমতার বাড়ি গিয়েছিলেন অভিষেক। এসআইআর পর্বে বুথ লেভেল এজেন্টদের (বিএলএ) কীভাবে কী কী কাজ করতে হবে, কোন কোন দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে, সেসব জানাতে অভিষেক বারবার ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেছেন। আজ শনিবার বিকেলেও তেমনই বৈঠক হতে চলেছে।