কালবৈশাখী, বজ্রসহ ভারী বর্ষণে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ভোগান্তির সম্মুখীন হয়েছে পরীক্ষার্থীরা। ঝড়ের তাণ্ডবে গাছপালা উপড়ে বিদ্যুতের মেইন লাইনের ওপর পড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং অনেক স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়ায় পুরো এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষে মোমবাতি ও চার্জারের আলোয় পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছে পরীক্ষার্থী। এ ছাড়া অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারণে হাঁটুপানিতে বসেও পরীক্ষা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর, ফেনীর পরশুরাম ও সোনাগাজী উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা দিতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। গত সোমবার রাতে ঝড়ের কারণে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল এসব অঞ্চল। এ ছাড়া অতিবৃষ্টিতে কুমিল্লা শহরজুড়ে জলাবদ্ধতার কারণে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে হাঁটুপানিতে বসে পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য হয় শিক্ষার্থীরা। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন—
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় কালবৈশাখীতে বৈদ্যুতিক লাইনের ওপর গাছ পড়ে ও বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অধিকাংশ এলাকা। মেঘলা আকাশ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে বিদ্যুৎ না থাকায় মোমবাতি ও চার্জারের আলোয় পরীক্ষা দেয় কয়েকশ পরীক্ষার্থী। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় উপজেলার কয়েকটি পরীক্ষা কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরীক্ষা চলাকালে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় কক্ষগুলোতে পর্যাপ্ত আলো ছিল না। পাশাপাশি ফ্যান বন্ধ থাকায় গুমোট গরমের কারণেও পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হয়।
অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা গেছে। এক অভিভাবক বলেন, পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যেমন জেনারেটর বা আইপিএস না থাকাটা দায়িত্বশীলদের গাফিলতি।
একাধিক পরীক্ষার্থী জানায়, পরীক্ষা চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় কক্ষ অন্ধকার হয়ে পড়ে। মোমবাতি ও চার্জারের আলোয় প্রশ্নপত্র পড়তে ও উত্তর লিখতে তাদের বেশ কষ্ট হয়েছে। ফ্যান বন্ধ থাকায় গুমোট গরমে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই জানায়, ঝড়-বৃষ্টির কারণে সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছতেও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ মতলব উত্তর জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঝড়ে লাইনের ওপর বড় বড় গাছ ভেঙে পড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বেশ কয়েকটি স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় মেরামতের কাজ শেষ করতে সময় লেগেছে। তবে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়।
মতলব উত্তর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, আমরা কেন্দ্র সচিবদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি, যাতে কোনো অবস্থাতেই পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা ব্যাহত না হয়। যেখানে বিদ্যুৎ সমস্যা রয়েছে, সেখানে বিকল্প আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
ঝড়-বৃষ্টির কারণে লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার এসএসসি, দাখিল ও কারিগরির ৭টি পরীক্ষা কেন্দ্রে এসি-ডিসি লাইট ও মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা দিয়েছে এসএসসি ও দাখিল সমমানের পরীক্ষার্থীরা। বাধ্য হয়ে এসি-ডিসি লাইট ও মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া পরীক্ষায় উপজেলার ৪টি এসএসসি, দুটি দাখিল এবং একটি কারিগরি (ভোকেশনাল) কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা এ দুর্ভোগের মুখে পড়ে।
পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বখতারমুন্সী মোয়াজ্জেম হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়, ভোরবাজার অ্যাডভোকেট বেলায়েত হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় এবং বখতারমুন্সী ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা শুরুর আগেই বিদ্যুৎ চলে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ ফিরলেও ২০-২৫ মিনিট পর আবার চলে যায় এবং পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত আর আসেনি। ফলে তিন ঘণ্টার পরীক্ষার মধ্যে খুব অল্প সময় বিদ্যুৎ ছিল। পুরো সময় এসি-ডিসি লাইট ও মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা দিতে হয়।
অন্যদিকে, সোনাগাজী মো. ছাবের সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাগাজী বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাগাজী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা এবং কারিগরি কেন্দ্রেও বেলা সাড়ে ১১টা থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। এতে শিক্ষার্থীদের এসি-ডিসি লাইট ও মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা দিতে হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিগ্যান চাকমা দুটি কেন্দ্রের আলোর স্বল্পতা নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া ফেনীর পরশুরামে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটায় মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা দিয়েছে ১ হাজার ১২৯ পরীক্ষার্থী। শিক্ষার্থীরা বলে, প্রচণ্ড তুফানে বারবার মোমবাতিও নিভে গেছে, এতে পরীক্ষা দিতে চরম সমস্যা দেখা দিয়েছে। গতকাল চলমান এসএসসি, দাখিল ও ভোকেশনাল পরীক্ষার দুটি কেন্দ্রে এ চিত্র দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা যায়, পরশুরাম সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এসএসসি এবং পরশুরাম সরকারি ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে দাখিল পরীক্ষা চলছিল। সকাল থেকে কালবৈশাখী শুরু হলে পল্লী বিদ্যুতের ৩৩ কেভি লাইনে বিভ্রাট দেখা দেয়। এতে পুরো পরশুরাম উপজেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরীক্ষা কক্ষে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় শিক্ষার্থীরা মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা দেয়।
এ বিষয়ে পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম সাফায়েত আক্তার নূর জানান, বিদ্যুৎ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে ঝড়-বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে তারের ওপর গাছের ডাল ভেঙে পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে কেন্দ্রগুলোতে মোমবাতি ও চার্জ লাইটের ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে, গতকাল সকালে কুমিল্লা শহরে এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় হাঁটুপানি জমে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন এসএসসি পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বৃষ্টি ও ঝড় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন কেন্দ্রে বিদ্যুৎ চলে যায়। কোনো কোনো কেন্দ্রে মোমবাতি ও চার্জলাইট জ্বালিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। অনেক কেন্দ্রে পানি জমে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাদের। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের হাঁটু ও কোমরসমান পানি মাড়িয়ে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়।
কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালা স্কুল কেন্দ্রের সামনে পরীক্ষা শেষে ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে অভিভাবক হারুনুর রশিদ বলেন, পরীক্ষা শুরু হওয়ার ২০ মিনিট পরই বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর মোমবাতি ও চার্জার লাইট দিয়ে ভেতরে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই কেন্দ্রে পানি প্রবেশ করে। স্কুলের পুরোনো ভবনে যে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে লিখতে হয়েছে। পানিতে পা ডুবিয়ে রেখেই পরীক্ষা দিতে হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নিয়মিত পরিষ্কারের অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু সাংবাদিকদের বলেন, গত ১৪ বছর কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে উন্নয়নের নামে লুটপাট হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে তারা কার্যকর কোনো কার্যক্রম নেয়নি। আমি গত মাসে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি। এরই মধ্যে নগরীর রেইসকোর্স খাল এবং কান্দিরপাড় খাল খনন সম্পন্ন করেছি। যেসব জায়গায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে সেসব এলাকা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমিল্লা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা সৈয়দ আরিফুর রহমান জানান, মঙ্গলবার সকালে কুমিল্লায় ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আরও বৃষ্টি হতে পারে।