সারা দেশে মাদকের বিস্তার রোধ এবং মাদকচক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে সমন্বিত অভিযানে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে প্রস্তুত করা মাদক কারবারিদের একটি হালনাগাদ তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তালিকায় ২৩ হাজারের বেশি ব্যক্তির নাম রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই তালিকা ধরে কয়েক দিনের মধ্যে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, এবারের অভিযানে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত বা ‘গডফাদার’ বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা আড়ালে থেকে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁদের আইনের আওতায় আনতে আলাদা কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
হালনাগাদ তালিকায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা ইশতিয়াক আহমেদের নাম রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কার্যক্রম মোহাম্মদপুরের বাইরে গাবতলী, আমিনবাজার ও সাভার পর্যন্ত বিস্তৃত।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় ২৩ হাজার ৩০০ জন, পুলিশের তালিকায় ১৯ হাজার এবং বিজিবির তালিকায় প্রায় তিন হাজার সন্দেহভাজন কারবারির নাম রয়েছে। এসব তালিকা যাচাই-বাছাই করে একটি সমন্বিত তালিকা করা হয়েছে। যাঁদের নাম একাধিক সংস্থার তালিকায় রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রথম ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযান পরিচালিত হবে। তাঁর ভাষ্য, ‘জিরো টলারেন্স নীতির আওতায় আগের তুলনায় আরো কঠোরভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অনেক ক্ষেত্রে মাদকচক্রের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়, কারণ তাঁরা নিজেরা সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন না। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক আইনের পাশাপাশি মানি লন্ডারিং বা অর্থপাচার আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও প্রস্তুতি চলছে। তাঁদের সম্পদের উৎস যাচাই করা হচ্ছে।
গত সোমবার জাতীয় সংসদে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ৩০ এপ্রিল সংসদ অধিবেশন শেষ হওয়ার পর সমন্বিত অভিযান শুরু হতে পারে। বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের এক নোটিশের জবাবে তিনি বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় অভিজাত এলাকায় মাদক কারবার বেড়েছে; বিশেষ করে গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডিতে সিসা বারের আড়ালে মাদকের কারবার চলছে। সিসা বার বন্ধ করা হলেও প্রভাব খাটিয়ে তা আবার চালু করা হয়। এবার সেসবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করা হবে।’ মন্ত্রী আরো স্পষ্ট করেন যে যদি কোনো প্রশাসনের কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্য এই মাদক কারবারে মদদ দেন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কক্সবাজার ও টেকনাফ এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ মাদকের বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এখন তাঁদের কেউ কেউ পাইকারি পর্যায়ের কারবারে যুক্ত হচ্ছেন। টেকনাফের হোয়াইক্যং, শাহপরীর দ্বীপ ও সাবরাং এলাকায় রোহিঙ্গাদের একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। টেকনাফে সক্রিয় মাদক কারবারিদের মধ্যে রয়েছেন বার্মাইয়া নুর, ফয়েজ আহমদ, জিয়াবুল হক জিয়াসহ কয়েকজন, যাঁদের কেউ কেউ রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত। কক্সবাজারেই শতাধিক মাদক গডফাদার শনাক্ত করা হয়েছে। মায়ানমারের নাগরিক আবু নফর, ইমাম শরীফ ও মঞ্জুর আলমের মতো ব্যক্তিদের নামও উঠে এসেছে এই তালিকায়।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সহস্রাধিক প্রভাবশালী মাদক কারবারি সক্রিয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলেই তিন শতাধিক রয়েছে। তালিকায় পাইকারি পর্যায়ের বিক্রেতা ছয় হাজারের বেশি। ঢাকা মহানগরীতেও মাদক কারবারির সংখ্যা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যাঁরা মারা গেছেন বা দীর্ঘদিন কারাগারে আছেন, তাঁদের নাম বাদ দিয়ে তালিকাটি হালনাগাদ করা হয়েছে।
তালিকায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার কয়েক ডজন মাদক কারবারির নাম উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে মোহাম্মদপুরের সেলিম, হিরা ও সোহেল; মিরপুরের ফতেহ; শাহবাগের সজল; তেজগাঁওয়ের আব্দুল আমিন এবং কড়াইল বস্তির কামাল ও সবুজ অন্যতম। ঢাকার বাইরে কুমিল্লার ধর্মপুরের আশিক ও আবুল কাশেম; সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের আব্দুল মান্নান; জকিগঞ্জের আব্দুল কাদির এবং হবিগঞ্জের মামুন মিয়ার নাম তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও পাবনার শীর্ষ মাদক বিক্রেতারাও গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন।
সচেতন নাগরিক ও অভিভাবকদের একটি অংশ সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, মাদকের বিস্তারের সঙ্গে কিশোর গ্যাং ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। বিশেষ করে নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক তরুণদের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এবারের অভিযান শুধু তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ না রেখে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, ‘মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের জন্য বার্তা স্পষ্ট—এই কার্যক্রম থেকে সরে আসতে হবে, অন্যথায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’