দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিজাত ক্লাবে নাম লেখালো বাংলাদেশ। এক দশকের নিরবচ্ছিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং জটিল সব কারিগরি ধাপ পেরিয়ে অবশেষে মিলেছে কাঙ্ক্ষিত ‘কমিশনিং লাইসেন্স’। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটে মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এর মাধ্যমেই শুরু হলো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরীক্ষামূলক উৎপাদন প্রক্রিয়া। এটি দেশের কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতর এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, রাশিয়ান সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাআভ বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি বাংলাদেশকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য আজকের দিনটি এক ঐতিহাসিক দিন।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি সংকটে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বড় ভূমিকা রাখবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এই কেন্দ্রের জ্বালানি 'ইউরেনিয়াম' আসে দেশে। এতদিন সর্বোচ্চ সতর্কতায় প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষিত করা ছিল জ্বালানি। আজ মঙ্গলবার যা রিয়েক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লিপাত্রে বসানো হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এই ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর সমৃদ্ধ ধাতব পদার্থটি খনির আকরিক থেকে নানা প্রক্রিয়া করে তৈরি করা এই ইউরেনিয়ামের জ্বালানি যেন দেশ এবং পরিবেশের জন্য কোনো হুমকির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় এর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। এ জন্য ইতোমধ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ শ্রেণির জেনারেশন ৩ প্লাস রিয়েক্টর স্থাপন করা হয়েছে।
করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক নানা প্রতিবন্ধকতায় কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও সরকারের দৃঢ়তায় এই মাইলফলক স্পর্শ করা সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নজরদারি এবং নিরাপত্তার সব শর্ত পূরণ করায় গত ১৬ এপ্রিল রূপপুর কর্তৃপক্ষকে পরমাণু চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের লাইসেন্স প্রদান করা হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, মঙ্গলবার বিকেলে প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হবে। এটি দেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে আগামী জুলাই বা আগস্ট মাসের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে। এক বছর পর প্রথম ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে সেখান থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পাবে দেশ। উৎপাদিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হওয়ার কার্যক্রমে রূপপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থেকে উদ্বোধন করবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রকল্প এলাকা বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ)প্রতিনিধি , নির্মাণকারী দেশ রাশিয়াসহ বেশ কিছু বিদেশী প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুভ উদ্বোধনের জন্য বিকেল ৩টায় প্রকল্প এলাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব ফকির মাহবুব আনাম, এমপি। সম্মানিত অতিথিদের বক্তব্য রাখবেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা জনাব রেহান আসিফ আসাদ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মহাপরিচালক জনাব রাফায়েল গ্রসি (ধারণকৃত বক্তব্য), রাশিয়ার রাষ্ট্রিয় পারমাণবিক সংস্থার (রোসাটম) মহাপরিচালক জনাব এলেক্সি লিখাচভ। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব জনাব মো. আনোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কিত ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হবে জানান তিনি।
রূপপুর প্রকল্পের ইতিহাস সুদীর্ঘ। ১৯৬০-এর দশকে এর প্রাথমিক ধারণা উত্থাপিত হয়। ১৯৬২ সালে সম্ভাব্য বারোটি স্থান মূল্যায়নের পর পাবনার রূপপুরকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান Sofratom কর্তৃক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হলেও তৎকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন দীর্ঘসময় ধরে স্থগিত থাকে।
ড. জাহেদুল হাসান জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে রিঅ্যাক্টর ভবন, টারবাইন ভবন, কুলিং সিস্টেম, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন এবং বিভিন্ন সহায়ক স্থাপনাসহ মোট ৩৮৯টি স্থাপনার একটি বিস্তৃত অবকাঠামোর ভৌত নির্মাণ কাজ প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে। ভৌত নির্মাণ কাজ সমাপ্তির পর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ এর প্রস্তুতি পর্যায় শুরু হচ্ছে।
পরবর্তীতে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার বৃদ্ধি করা হয় ও নিরাপত্তা বিষয়ক পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয় যা Stage D- Trial Operation নামে অভহিত করা হয়। উক্ত সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জাতীয় গ্রীডে ১০০% বিদ্যুৎ পেতে প্রায় ১০ মাস সময়ের প্রয়োজন হবে বলে জানান তিনি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন, রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তিভিত্তিক দুটি ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে যার প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতা রয়েছে। আধুনিক কন্টেইনমেন্ট কাঠামো, কোর ক্যাচার এবং মাল্টি-লেভেল সেফটি ডিজাইনের সমন্বয়ে এই প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত।
কাজেই, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটি নতুন যুগের সূচনা হবে। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করবে এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। একইসাথে, এই প্রকল্প বাংলাদেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।