Image description

এনজিওর ঋণ শোধ করতে না পেরে সপরিবার জীবন দিয়েছেন রাজশাহী জেলার মনিরুল। শুধু মনিরুল নন, উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে প্রতিনিয়ত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, এমনকি ঘরের চাল হারাচ্ছে দেশের বহু মানুষ। তার পরও প্রতি মাসেই বাড়ছে এসব বেসরকারি সংস্থার ঋণ বিতরণ। আর এসব এনজিওকে তহবিল সহায়তা দিচ্ছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংক থেকে কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া আরো সহজ করা উচিত, যেন সাধারণ কৃষক চাইলেই ব্যাংক থেকে স্বল্প থেকে স্বল্প সুদে ঋণ পেতে পারেন। যদি ব্যাংকে বাধ্যবাধকতার ফলে এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের কৃষকসমাজ। কোন উৎস থেকে ঋণ নেবে, তা কৃষকের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে এনজিওগুলোর কৃষিঋণ ৯.৬২ শতাংশ বেড়েছে।

অন্যদিকে ৩১.৮২ শতাংশ কমেছে ব্যাংক খাতের কৃষিঋণ বিতরণ কার্যক্রম। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকের তহবিলে ক্রমেই বাড়ছে নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এনজিও) ঋণ পরিধি। প্রান্তিক পর্যায়ে শাখা না থাকায় অনেক ব্যাংক এনজিওর মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে ব্যাংকের কৃষিঋণ বিতরণের শর্ত পূরণ হয় ঠিকই, মাঝখান থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ কৃষক।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের (সিএসপিএস) নির্বাহী পরিচালক ও মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, কৃষিঋণ বিতরণে বেশির ভাগ বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনীহা রয়েছে। তা ছাড়া কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণে কস্ট অব ফান্ড বেশি হওয়ায় এগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে ব্যাংকগুলো। তবে আইনের হাত থেকে বাঁচতে দেশের অনেক ব্যাংক এনজিওর মাধ্যমে ঋণগুলো বিতরণ করে। এতে যে কৃষক উপকৃত হন না তা বলা যাবে না। উপকৃত হন ঠিকই, কিন্তু সুদের হার অনেক বেশি দিতে হয়।

ব্যাংকের স্বল্প সুদের ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে এনজিওগুলো। এখানে তারা মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে কাজ করে। ফলে উচ্চ সুদের ঘানি টানতে হয় সাধারণ কৃষককে।

মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় ক্ষুদ্রঋণ নেওয়া অনেক পরিবার কিস্তির চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। ঋণ শোধ করতে গিয়ে ভিটামাটি, গবাদি পশু বিক্রি করার ঘটনাও ঘটছে। এমনকি কিস্তির চাপ থেকে মুক্তি পেতে আত্মহনন বা অঙ্গ বিক্রির মতো চরম ঘটনাও সামনে এসেছে। ঋণসংক্রান্ত বিরোধে পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অবক্ষয় এবং সংসার ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। আর এই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

রাজশাহীর পবা উপজেলায় সপরিবার প্রাণ হারানো মনিরুল ইসলামের বাবা কালের কণ্ঠকে বলেন, আমার ছেলেটা প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দিতে না পেরে জীবন দিল। এই ঋণের বোঝা না থাকলে হয়তো আমার ছেলেটাকে প্রাণ দিতে হতো না। এনজিওর ঋণের চাপে আজ আমি ছেলে, বউমা, নাতি-নাতনিহারা।

বিভিন্ন ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য ঘেঁটেও এই ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। যেমনবর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভালো ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটা দি সিটি ব্যাংক। এই ব্যাংক ২০২৪ সালে এনজিওর মাধ্যমে কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছে দুই হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ৩৮৩ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংক করেছে ৬৭৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে সহায়তার লক্ষ্যে শীর্ষ ১১টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) মোট ১৯ হাজার ৩৩৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৬২ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে একই মাসে সব তফসিলি ব্যাংকের কৃষিঋণ বিতরণ দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৩৫১ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা আগের মাসের তুলনায় ৩১.৮২ শতাংশ কম, তবে আগের বছরের জানুয়ারির তুলনায় ১৩.৩৬ শতাংশ বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, কৃষিঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এর বড় অংশ যদি উচ্চ সুদের ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে হয়, তাহলে কৃষকদের ওপর চাপ বাড়ে। কারণ এনজিওগুলোর ঋণের সুদের হার সাধারণত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, যেখানে ব্যাংক খাতে কৃষিঋণের সুদ মাত্র ৪ শতাংশ। ফলে একই ঋণ নিতে কৃষকদের খরচের পার্থক্য বিশাল হয়ে দাঁড়ায়।

জানুয়ারি ২০২৬-এ ক্ষুদ্রঋণ খাতে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণ বিতরণ করেছে ব্র্যাক, যার পরিমাণ সাত হাজার ২৮৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আশা বিতরণ করেছে তিন হাজার ৭১৯ কোটি তিন লাখ টাকা এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা গ্রামীণ ব্যাংকের বিতরণ ছিল দুই হাজার ৪৭০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এ তিন প্রতিষ্ঠানই মোট ঋণ বিতরণের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। এ ছাড়া বুরো বাংলাদেশ দুই হাজার ৪০ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং টিএমএসএস এক হাজার ১৭৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। সোসাইটি ফর সোশ্যাল সার্ভিসের (এসএসএস) বিতরণ ছিল এক হাজার ২৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন (জেসিএফ) দিয়েছে ৭৭৩ কোটি সাত লাখ টাকা।

অন্যদিকে তুলনামূলক কম ঋণ বিতরণ করেছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে শক্তি ফাউন্ডেশন ২৭৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, আরডিআরএস বাংলাদেশ ২৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা, প্রশিকা ২১১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং কারিতাস বাংলাদেশ ৮৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে।

ঋণ আদায়েও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারিতে এমএফআইগুলোর আদায় দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২৮৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.৮৪ শতাংশ বেশি। তবে একই সঙ্গে বাড়ছে বকেয়া ঋণের চাপ। জানুয়ারি শেষে মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ২৬৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা বছরে ১২.৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি। বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আট হাজার ২৬৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭.৭১ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণগ্রহীতাদের অনিয়মিত আচরণের কারণে বকেয়া বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থায়নে ঋণ বিতরণ ও আদায় বাড়লেও সম্পদের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ব্যাংকগুলো মোট ২৪ হাজার ৩৫৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬.৭৭ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের কৃষি সম্প্রসারণে ব্যাংক ও এনজিও উভয় দরজাই উন্মুক্ত থাকা উচিত। একজন কৃষক যদি চান তাহলে তিনি যেন ব্যাংক থেকে অথবা এনজিও থেকে ঋণ নিতে পারেন, সেটা তিনি নিজেই পছন্দ করুক। কেননা এনজিওর কাছ থেকে বেশি সুদে ঋণ নিলেও সেটা তাঁর জন্য উপকার। কারণ একটা এনজিও ঋণ দিয়ে নিয়মিত তদারকি করে এবং ফসল ফলাতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকে। ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে ঋণ দেওয়ার পর প্রত্যেকটি কৃষককে ব্যাংকের পক্ষে তদারকি করা সম্ভব হয় না। ফলে এক খাতের ঋণ অন্য খাতে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদিও ব্যাংক থেকে কৃষিঋণের সুদের হার কম। তার পরও কাগজপত্র জাটিলতা ও প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকের শাখা না থাকার কারণে সব কৃষক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন না। তাই ঋণের বিষয়টি কৃষকের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সুদের হার বেশি হওয়া সত্ত্বেও কৃষককে বাধ্য হয়ে যেন এনজিওতে যেতে না হয়।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বিষয়টি স্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, অনেক ব্যাংকই এমএফআই বা নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে কৃষক পর্যায়ে ঋণের সুদ ২০ থেকে ২২ শতংশ পর্যন্ত উঠে যায়। এই সমস্যা সমাধানে সব ব্যাংককে এগিয়ে আসা উচিত। যেমনআমাদের ব্র্যাক ব্যাংক মোট ঋণের ৫০ শতাংশের বেশি কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে থাকে। শুধু তা-ই নয়। আমরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিই, যেন তারা ব্যাংকের আইন-কানুন বোঝে ও ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদের ঋণ নেয়। তা ছাড়া আমরা নিয়মিত প্রোজেক্ট তদারকিও করি। এভাবে সব ব্যাংক এগিয়ে এলে কৃষকদের আর বেশি সুদের এনজিও থেকে ঋণ নিতে হবে না।