Image description

কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষকের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আত্মহত্যা করে এক শিশু। ২০১৫ সালের ওই ঘটনায় পুলিশের অসহযোগিতা ও আইনি জটিলতায় তখন মামলা করেনি পরিবার। সেই ঘটনার ১১ বছর পর যৌন হয়রানির পৃথক ঘটনায় এক শিক্ষার্থীর বাবার করা মামলায় আটক হয়েছেন তিনি।

 

অভিযুক্ত মো. জাকির হোসেন খন্দকার ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন থেকে তিনি বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের একা পেলে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাজে প্রস্তাব দিতেন। রোববার (১৯ এপ্রিল) এক ছাত্রীকে কক্ষে ডেকে নিয়ে আপত্তিকর আচরণের চেষ্টা করলে ভুক্তভোগীর চিৎকারে বিষয়টি সামনে আসে। পরে আরও ছাত্রীরা একই ধরনের অভিযোগ তোলে।

 

এ ঘটনায় স্থানীয়রা ওই শিক্ষককে বিদ্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। খবর পেয়ে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার পর স্কুলে তালা ঝুলিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।

 

বুধবার (২২ এপ্রিল) সরেজমিনে ওই স্কুলের সামনে কয়েকজন ভুক্তভোগী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে জাকিরের যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে অনেক শিক্ষার্থী। এমনকি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আত্মহত্যা করেছে একজন।

 

 

জুঁই (ছদ্মনাম) নামের এক শিক্ষার্থী জানান, আমার বড় বোনের সঙ্গে প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন খন্দকার বিভিন্ন সময় খারাপ আচরণ করেছেন। আমাকেও বিভিন্ন সময় বাজে প্রস্তাব দিয়েছেন। কক্ষের দরজা বন্ধ করে ব্যাড টাচ করেছেন।

 

নুসরাত (ছদ্মনাম) নামের সাবেক এক শিক্ষার্থীর মা বলেন, ২০১৫ সালে আমার দুই মেয়ে এই স্কুলে পড়ত। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বিভিন্ন সময় বড় মেয়েকে বাজে প্রস্তাব দিতেন। ব্যাড টাচ করতেন। একদিন স্কুলের একটি কক্ষে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। ঘটনার পর মেয়ে স্কুল থেকে কান্না করতে করতে বাসায় এসে আমাকে সব খুলে বলে। ওইদিনই আমার মেয়ে আত্মহত্যা করে।

 

তিনি বলেন, মেয়েকে দাফনের পর থানায় মামলা করতে চাইলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মামলা করলে কবর থেকে মরদেহ তুলে ময়নাতদন্ত করতে হবে। তারপর মামলা হবে। তখন আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ না থাকায় মামলা করিনি।

 

ভুক্তভোগী এক ছাত্রীর বাবা বলেন, আমার দুই মেয়ে ওই স্কুলে পড়ত। গত রমজানে বড় মেয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। কারণ জিজ্ঞেস করলে জানায়, প্রধান শিক্ষক বাজে প্রস্তাব দেন। বিভিন্ন সময় শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করে। কয়েকদিন পর ছোট মেয়েও একই অভিযোগে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরে তাদের সহপাঠীরা জানায়, তাদের সঙ্গেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

 

তিনি বলেন, ওই ঘটনার পর এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানাই। আমার মেয়েসহ অন্য ভুক্তভোগীদের নিয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় অভিযোগ করতে যাই। থানা থেকে বলা হয়, যেহেতু শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয়; আপনারা আগে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে যান। তার সঙ্গে পরামর্শের পর আমাদের কাছে আসবেন। সে অনুযায়ী ১৯ এপ্রিল উপজেলা পরিষদে যাই। এর মধ্যেই কয়েকজন ফোন করে জানান, স্কুলে প্রধান শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তখন ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ এসে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

 

এদিকে আদালতে সাক্ষ্যদানকে কেন্দ্র করে বিপাকে পড়েন আরেক ছাত্রী। সাক্ষ্য না দিতে অভিযুক্তের পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে চাপপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। নিরাপত্তার কারণে পরে পুলিশ ওই শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা দিয়ে আদালতে নিয়ে যায়। তবে কোনো ধরনের চাপ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন জাকিরের স্বজনরা।

 

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোশাররফ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে শ্লীলতাহানির অভিযোগ পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় তদন্ত চলমান রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

ইতোপূর্বে ধর্ষণের শিকার এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, এমন অভিযোগ শুনেছি। কিন্তু কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ করেনি। কেউ মামলা করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।