ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রচারের জন্য সারা দেশে বিলবোর্ড স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১২ কোটি টাকা। জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক ঋণের চাপ ও কৃচ্ছ্রতা নীতির কারণে বর্তমানে যখন ব্যয় কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, ঠিক এমন সময়েই এ প্রস্তাব এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্য জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যয় পরিকল্পনাটি নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা বিশ্লেষণে জানা যায়, স্থানীয় সেবার তথ্য উন্মুক্ত করতে সারা দেশের ৪ হাজার ৫৭৮টি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মোট ৪১ হাজার ২০২টি ইলেকট্রনিক বিলবোর্ড স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি বিলবোর্ডের খরচ ধরা হয়েছে ১ লাখ টাকা। এতে মোট ব্যয় হবে ৪১২ কোটি টাকা। কাজ শুরুর প্রথম তিন মাসেই ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
নথি অনুযায়ী, এ অর্থের জোগান দিতে ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন সহায়তা খাতের সাধারণ থোক বরাদ্দ থেকে পৃথক অনুশাসন দেওয়া হতে পারে। এতে প্রতি ইউনিয়নে ১ লাখ টাকা খরচ করা যাবে এবং ৪৬ কোটি টাকার সংস্থান রয়েছে। বাকি ৩৬৬ কোটি টাকার সংস্থান চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের শেষ চার মাসে (মার্চ-জুন) ৩০০ কোটি টাকা এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ১১২ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সূত্র জানায়, সুবিধাজনক স্থানে এসব ইলেকট্রনিক বিলবোর্ড স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যক্রম সম্পর্কে স্থানীয় জনগণকে জানানো হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে ভুল অন্তর্ভুক্তি শনাক্ত করা এবং যোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কোনো যোগ্য ব্যক্তি বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করার বিষয়টিও বিলবোর্ডের মাধ্যমে জানানো হবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নসংক্রান্ত কাজ উন্নয়ন অনুবিভাগ দেখছে। পরে উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর কাছে পরিকল্পনার যৌক্তিকতা জানতে চাওয়া হলেও তিনি তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেননি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচিগুলো নিঃসন্দেহে জনকল্যাণমূলক এবং এর প্রচার জরুরি। তবে বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রচারের জন্য এত বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন।' তিনি এ প্রকল্পের ব্যয়-সুফল বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, 'প্রচারের জন্য ডিজিটাল বিলবোর্ডই কি একমাত্র বিকল্প ছিল? নাকি বিটিভি, বেতার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো আরও সাশ্রয়ী ও কার্যকর মাধ্যম ব্যবহার করা যেত, তা ভেবে দেখা উচিত।'
তিনি আরও বলেন, 'ডিজিটাল বিলবোর্ড স্থাপনের প্রাথমিক ব্যয়ের পাশাপাশি অবকাঠামো নির্মাণ, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বড় অঙ্কের ব্যয় জড়িত। শেষ পর্যন্ত এটি জনগণের ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।' তিনি সতর্ক করে বলেন, 'এ ছাড়া এ ধরনের বড় প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে অর্থের অপচয় বাড়তে পারে। বিশেষ করে পছন্দের ভেন্ডর বা ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম হলে এমনটি ঘটতে পারে। জনকল্যাণমূলক কাজের প্রচারে যদি অর্থের অপচয় হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই বিকল্প সাশ্রয়ী মাধ্যম বিবেচনা করে টেকসই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।'