বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিচারহীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের সংস্কৃতি বন্ধে চার দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, দেশে নির্যাতন প্রতিরোধে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব আইনই অপব্যবহারের শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে জানান, তিনি নিজেও রাষ্ট্রীয় সংস্থার হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদে যোগ দেয় এবং ২০১৩ সালে ‘হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ আইন’ প্রণয়ন করে। কিন্তু এই আইন প্রণয়নের পরই দেশে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। তার মতে, আইনটি কার্যকরভাবে প্রয়োগের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও নির্যাতনের শিকার। আমাকে পুলিশ স্টেশন, র্যাব ও ডিবি কার্যালয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।’ তিনি আরও দাবি করেন, একটি সংবাদপত্র পরিচালনা এবং সত্য প্রকাশের কারণে তাকে প্রায় পাঁচ বছর কারাভোগ করতে হয়েছে। সে সময় দেশে নির্যাতন একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছিল। দেশে নির্যাতনের এই সংস্কৃতি বন্ধে মাহমুদুর রহমান চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরেন—
১. রাজনৈতিক সদিচ্ছা:
তার মতে, নির্যাতন বন্ধে সর্বপ্রথম প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
২. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও তদারকি:
পুলিশি রিমান্ডের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, নিম্ন আদালতগুলো কার্যত নিয়ন্ত্রণাধীন থাকায় রিমান্ডের নামে নির্যাতন যথাযথভাবে তদারকি হয় না।
৩. পুলিশের আধুনিক প্রশিক্ষণ:
জবানবন্দি আদায়ে শারীরিক নির্যাতনের পরিবর্তে আধুনিক জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি ব্যবহারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রশিক্ষিত করতে হবে।
৪. ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন:
রাষ্ট্রীয় বা পুলিশি নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অতীতের শাসনামলের তুলনায় বর্তমান সরকার মানবিক আচরণ প্রদর্শন করবে এবং দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুধু আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর বা আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার এবং মানসিকতার পরিবর্তন।
উল্লেখ্য, নির্যাতন প্রতিরোধ এবং জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদ (ইউএনসিএটি) ও এর ঐচ্ছিক প্রটোকল (ওপিসিএটি) বাস্তবায়ন নিয়ে দুই দিনব্যাপী জাতীয় পরামর্শ সভা ঢাকায় শুরু হয়েছে। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ২৫-২৬ এপ্রিল এই ‘ন্যাশনাল কনসালটেশন’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওএমসিটির সহযোগিতায় সভার আয়োজন করেছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার।
এই পরামর্শ সভায় নির্যাতন প্রতিরোধ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সনদ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইউএনসিএটি এবং ওপিসিএটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েও অংশগ্রহণকারীরা মতামত দিচ্ছেন।
দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সুপারিশ প্রণয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।