Image description

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নিয়ে নতুন করে এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করে গেছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন এই পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতুর লিঙ্কেজ মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে মিলবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। যার সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করা হয়েছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ প্যানেল এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর শুরু হবে নতুন আরও চারটি র‌্যাম্পের কাজ। সেতু বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক এ এইচ এম সাখাওয়াত আখতার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা খুব তাড়াতাড়ি আবার কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। দুই ফেইজে কাজ চলছে নিরবচ্ছিন্ন। যেহেতু মাঝখানে অনেকটা সময় আমরা লস করেছি, তাতে ব্যয়ও কিছুটা বেড়েছে। আমরা চেষ্টা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজটা কীভাবে শেষ করা যায়। আমাদের পুরো প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। নতুন চারটি র‌্যাম্পের বিষয়ে তিনি বলেন, তা এখনো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। তা  শেষ হলে আমরা নতুন করে বাড়তি অংশের কাজ শুরু করব। তাহলে তো বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কোনো সিগন্যাল ছাড়াই যাত্রীরা পদ্মা সেতু এলাকায় পৌঁছে যাবেন। তা করতে পারলে ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থা খুবই সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।

এর আগে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রথম পরিকল্পরা করা হয় ২০০৯ সালে। এরপর কেটে গেছে প্রায় দেড় যুগ। এরই মধ্যে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে কয়েকবার। একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে ব্যয়। যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালে। সেখানে এ প্রকল্পের মূল কাজই শুরু হয় ২০২০ সালে। অবশ্য এ প্রকল্পের প্রথম অংশ ইতিমধ্যে খুলেও দেওয়া হয়েছে যান চলাচলের জন্য। প্রকল্পের এই পর্যায়ে এসে সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগ বলছে, এ প্রকল্পের আরও চারটি নতুন র‌্যাম্প করা হবে। যার ফলে একদিকে মাওয়া এবং অন্যদিকে পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়কের সঙ্গে মিলবে। এজন্য একটি র‌্যাম্প হবে ৩০০ ফিটের সঙ্গে, মহাখালী বাস টার্মিনালের সঙ্গেও হবে একটি র‌্যাম্প, রামপুরা-আফতাবনগর ও খিলগাঁওকে যুক্ত করতে একটি এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের শেষ প্রান্ত মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য আরেকটি র‌্যাম্প নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

এদিকে প্রকল্প এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে গতিহারা হয়ে পড়েছে বিগত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া মেগাপ্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। যে প্রকল্পে গাড়ি ছোটার কথা বিদ্যুৎ গতিতে সে প্রকল্পের কাজ চলছে কচ্ছপ গতিতে। অবশ্য এ প্রকল্পের প্রথম অংশ বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট খুলে দেওয়ার পর এর সুফল পেতে শুরু করেছে ঢাকাবাসী। অপর দুই অংশ বনানী রেল স্টেশন হতে মগবাজার রেল ক্রসিং এবং মগবাজার  রেল ক্রসিং হতে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক (কুতুবখালী) অংশের কাজ প্রায় বন্ধের উপক্রম। জুলাই ২০২৪ এ ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর থেকে নানা জটিলতায় এ কাজ চলছে খুবই স্বল্প পরিসরে। রাজধানীর পান্থকুঞ্জ এলাকায় এ প্রকল্পের কাজ প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর আবার চালু হয়েছে। একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে মগবাজার, মৌচাক ও খিলগাঁও, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী এলাকায়। এসব এলাকায় র‌্যাম্পের ওপর গার্ডার বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। জানা গেছে, আরেক দফা ব্যয় বাড়ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের। আইনি জটিলতা ও অর্থ সংকটের কারণে ৯ মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকার পর সীমিত পরিসরে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ফুল ফেজে শুরু হতে আরও কিছুটা সময় চেয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। তবে সময় বৃদ্ধির কারণে নির্মাণ ব্যয় আবার বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে গত আগস্টে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের পতনের কারণে জটিলতা আরও বেড়েছিল। যার কারণে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে এক ধরনের প্রকল্পটি নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছিল। এর ফলে প্রকল্পে অনেক জায়গা থেকে নিরাপত্তা কর্মীদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়। যেসব এলাকা টিন ঘিরে ফেলা হয়েছিল সেসব জায়গার টিনও কে বা কারা খুলে নিয়ে যায়। এখন আবার সবকিছু নতুন শুরু করেছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। যা এ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধিতে এক ধরনের নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

তথ্যমতে, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকাজের ৫১ শতাংশ শেয়ারের অধিকারী ছিল ইতালিয়ান থাই (ইতালথাই) ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি। আইনি জটিলতার কারণে সেটিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শেয়ার নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ব্যাংকঋণ ছাড় না হওয়ায় অর্থসংকটে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ একসময় ধাপে ধাপে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার নানা দপ্তরে চিঠি চালাচালির পর কাজ শুরু হয় সীমিত পরিসরে। আর গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর কাজের গতি কিছুটা বেড়েছে। বিমানবন্দরের কাওলা থেকে শুরু হয়ে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী এলাকায় গিয়ে শেষ হবে এ প্রকল্প। ইতিমধ্যে এর প্রথম অংশ বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট ও হাতিরঝিল যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটারের ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে এরই মধ্যে ৩১টি র‌্যাম্প বসানো হয়েছে। এর বাইরে নতুন করে আরও চারটি র‌্যাম্প বসানোর আগে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান।

এদিকে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, এক্সপ্রেসওয়ের যে মূল নকশা তার সক্ষমতা আছে কি না তা দেখতে হবে। মূল যে অবকাঠামো আছে, তার হজম করার সক্ষমতা আছে কি না? নতুন করে যে র‌্যাম যুক্ত হওয়া, তা করতে গেলে আবার নকশা করতে হবে। তার আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি দরকার। তা তো শুরু হয়েছে। আগে তা শেষ হোক। তারপর ডিটেইল ডিজাইন এবং সে অনুযায়ী কাজটা করতে হবে। এ বিষয়গুলো কিন্তু আসলে পুঙ্খানুপুঙ্খ চিন্তা করতে হবে।