অনুসন্ধান, মামলা, চার্জশিট কিংবা অভিযুক্তদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা- তিন সদস্যের কমিশনের অনুমোদন ছাড়া এসব গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারে না দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ৩ মার্চ চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার একসঙ্গে পদত্যাগ করার পর গত দেড় মাস ধরে এসব কাজের কোনোটিই করতে পারছে না দুদক; ফলে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে সংস্থাটিতে। বর্তমান সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ আইনে রূপান্তর না করে বাতিল করেছে। ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ পুনরায় ফেরত এসেছে। আগের এই আইনের ১১ ধারা অনুযায়ী কমিশন পদত্যাগ করলে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে নতুন কমিশন নিয়োগের কথা বলা আছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার ছিল ওই আইন অনুযায়ী শেষ দিন। এদিকে নতুন কমিশন নিয়োগ না হওয়ায় দুদকে চরম অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। আর আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কমিশন নিয়োগ না হওয়ায় নানাবিধ জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি মনোনীত একজন বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি প্রার্থীদের সুপারিশ করে থাকে এবং সেখানে কমিশন হয় তিন সদস্যবিশিষ্ট।
গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত কোনো বাছাই কমিটি গঠন হয়নি। তবে আপিল বিভাগের বিচারপতি এসএম ইমদাদুল হকের নেতৃত্বে একটি বাছাই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে ক্ষমতার জবাবদিহিহীন চর্চার ক্ষেত্রে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অন্তর্বর্তী সরকার আইনি বাধ্যবাধকতা ও জনপ্রত?্যাশা পদদলিত করে তথ্য কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন মাসের মাস গঠন করতে ব?্যর্থ হয়েছে। তবে বর্তমান সরকার তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তা-ও দুদকসহ সব নজরদারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কার্যকরতাসহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো অঙ্গীকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত এই সরকার। দুদকের কমিশনহীন অবস্থা যত দীর্ঘায়িত হবে ততই জনমনে প্রশ্ন জোরালো হবে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বা ৩১ দফা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এজেন্ডা কী শুধুই কাগুজে দলিল। দুদককে অনির্দিষ্টকাল স্থবির করে রাখার ফলে সরকার কী বাস্তবে কর্তৃত্ববাদের ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি সহায়ক ভূমিকার পথ বেছে নিয়েছে।
দুদকে সরকারের প্রভাবমুক্ত প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত, দক্ষ ও দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে নেতৃত্ব নিয়োগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অব?্যাহত ব?্যর্থতার পরিচয় দিলে তা হবে সরকারের জন?্য আত্মঘাতীমূলক। যা দেশবাসী দেখতে চায় না। দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, কমিশন ছাড়া দুদক একপ্রকার অচল। গত দেড় বছরে দুদক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবিরোধী ড্রাইভ দিয়েছে। সর্বোচ্চ সংখ্যক মামলা, চার্জশিট এবং সম্পদ জব্দ করেছে। এখন কমিশন অনুমোদন না দিলে অনুসন্ধান, মামলা অনুমোদন করা সম্ভব হয় না। এমনকি কমিশন না থাকায় আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া যাচ্ছে না। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, কমিশন ছাড়া দুদক আইনে নির্ধারিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে কমিশন থাকার সময় যেসব অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুমোদিত হয়েছিল, সেগুলো চলমান।