Image description
দখল-দূষণ হয়ে অস্তিত্ব হারানোর বেদনা, গিলে খাচ্ছেন দখলদাররা

চট্টগ্রাম নগরের দুঃখখ্যাত চাক্তাই খালের বয়স ২০০ বছরের বেশি। নিকট অতীতেও এ খাল দিয়ে কর্ণফুলী নদী হয়ে বন্দর থেকে আমদানি করা ভোগ্যপণ্য যেত সারা দেশে। চাক্তাই খাল দিয়ে নৌকা-সাম্পানে বোঝাই করে পণ্য যেত রামু, বান্দরবান, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, সন্দ্বীপ, পটিয়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালীতে। কিন্তু এখন আর সেই জলুস নেই খালটির। দখল-দূষণ হয়ে অস্তিত্ব হারানোর বেদনায় ধুকছে চাক্তাই খাল। অপরিকল্পিত নগরায়ণের সুযোগ নিয়ে খালটি গিলে খাচ্ছেন দখলদাররা।

ভয়াবহ দূষণে এ খালের পানির রং এখন কুচকুচে কালো। সেখানে ভাসছে পলিথিন, আবর্জনা, প্লাস্টিক পণ্য। খালের কোনো কোনো অংশে পানির প্রবাহ একেবারেই কম। কোনো কোনো এলাকার খাল দিয়ে পার হওয়া যায় হেঁটেই। খালের বিভিন্ন অংশে পড়েছে অবৈধ দখলদারদের নগ্ন ছোবল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, খালটি বাঁচবে তো? সেক্ষেত্রে ২০০ বছরের পুরোনো চাক্তাই খাল রক্ষা করবে কে? চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট মোড় থেকে বাদুরতলা-চকবাজার-বাকলিয়া হয়ে ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে খালটি মিশছে কর্ণফুলী নদীতে। নগরের

পানি নিষ্কাশনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম চাক্তাই খাল। খালটি দিয়ে নগরের কালুরঘাট, বহদ্দারহাট, টেরিবাজার, চান্দগাঁ, বাকলিয়া, শুলকবহর, বক্সিরহাট ও চকবাজারসহ অনেক এলাকার পানি প্রবাহিত হয়ে কর্ণফুলী নদীতে পড়ে। এলাকাভেদে খালটির প্রস্থ কোথাও ৭০ ফুট, কোথাও ২০ ফুট।

নগর উন্নয়নে ১৯৯৫ সালে প্রণীত মহাপরিকল্পনায় বলা হয়, চকবাজার, দেওয়ান বাজার, জামালখান, স্টেডিয়াম এলাকা, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে চাক্তাই খালের গুরুত্ব অনেক বেশি। জানা যায়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নগরের খালগুলো সংস্কার-উন্নয়ন কাজ করে। তবে বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের আওতায় চাক্তাই খাল সংস্কার-উন্নয়নের কাজ চলছে। তবে চসিকের প্রকৌশল বিভাগ জানায়, সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সময়ে ২০০৩-০৪ সালে সাড়ে ৯ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত গভীরতা রেখে চাক্তাই খালের বেশির ভাগ অংশের তলদেশ পাকা করা হয়। কিন্তু দুই-তিন বছর পর পাহাড়ি বালু, মাটি ও আবর্জনা জমে খালটি আবার ভরাট হয়ে যায়। এরপর গত ২২ বছরে খালটি আর খনন করা হয়নি। ফলে গভীর অংশে খালের গভীরতা পৌঁছেছে ৩ থেকে ৪ ফুটে।

চাক্তাই খালের দুই পাশে দেশের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা ভোগ্যপণ্য ২৫-৩০ বছর আগেও চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ থেকে এ খাল দিয়ে নৌযানে করে কর্ণফুলী নদী হয়ে সারা দেশে পরিবহন করা হতো। এমনকি চাক্তাই খাল থেকে কর্ণফুলী নদী ও চাঁনখালী খাল হয়ে সাঙ্গু নদীর মাধ্যমে বান্দরবানের থানচি ও রুমা উপজেলা পর্যন্ত নৌযানে করে পণ্য নেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে খালটির সেই অবস্থা নেই। অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে চাক্তাই খালের সংযোগস্থলে নির্মিত স্লুইচ গেটের কারণে বড় ট্রলার খালে প্রবেশ করতে পারছে না। এতে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে থেকে পণ্যও পরিবহন করা যাচ্ছে না।

কর্ণফুলী নদীর সত্তরোর্ধ্ব বয়সি মাঝি আবদুস সাত্তার বলেন, চাক্তাই খালের আগের চিত্র নেই। একটি ছোট নৌযান চলার গভীরতা দরকার অন্তত ১০ ফুট। কিন্তু বর্তমানে চাক্তাই খালের সর্বোচ্চ গভীরতা মাত্র ৩ থেকে ৪ ফুট (কিছু অংশে)। ১৫-২০ বছর আগেও চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর আশপাশের খাল ব্যবহার করে প্রতিদিন ৫০টির বেশি নৌযান পণ্য আনা-নেওয়া করত। সিডিএর চেয়ারম্যান মো. নুরুল করিম বলেন, সিডিএ জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের অধীন ৩৬টি খাল খনন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ খালের কাজ শেষ। সেখানে চাক্তাই খালও আছে। এ খাল থেকে অনেক অবৈধ স্থাপনা ও অবৈধ দলখদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। খালটি পরিষ্কারও করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে আবারও বর্জ্য ফেলা হয়। ফলে খালটিতে আবারও বর্জ্যে ভরে যায়।

চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের অধীন চাক্তাই খাল সংস্কার করা হয়েছে। চসিকও নিয়মিত রুটিন ওয়ার্ক করে। কিন্তু খালে যতদিন ময়লা-প্লাস্টিক ফেলা বন্ধ হবে না, ততদিন খাল পরিষ্কার রাখা সম্ভব হবে না। চসিক সূত্রে জানা যায়, নগরে ছোট-বড় মিলে ৫৭টি খাল আছে। এর মধ্যে সিডিএ মেগা প্রকল্পের অধীন ৩৬টি খালের উন্নয়ন-সংস্কার করছে। বাকিগুলো এখনো বেহাল। ৫৭টি খালের মধ্যে ১৬টি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া ৩১টি খাল কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিশেছে, যার মধ্যে ১৭টি সরাসরি যুক্ত। বাকি ১০টি খাল হালদা নদীতে গিয়ে পড়েছে। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার। তবে ইতিহাস অনুযায়ী নগরে এক সময় ১১৮টি খাল ছিল, যার অধিকাংশই এখন বিলুপ্ত।