Image description

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে। দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। চাল, ডাল, তেল, মাংস ও সবজিসহ প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজারে গিয়ে হতাশ ক্রেতারা। এদিকে দূরপাল্লার ট্রাকগুলোতেও বেড়েছে ভাড়া। ট্রিপ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংকট। ফলে সরবরাহ সংকট যুক্ত হওয়ায় নিত্যপণ্যের দামে প্রভাব ফেলেছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য খাদ্য বাবদ খরচ ক্রমেই বড় চাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়, বাজারদর বৃদ্ধি মানেই সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ। তারা জানান, জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত জ্বালানি তেল। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে সেচযন্ত্র, কারখানার উৎপাদন লাইন থেকে শহরের গণপরিবহন- সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরজমিন দেখা গেছে, পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ডিজেল নির্ভর তাই পরিবহন ব্যয় বাড়াতে পণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে নতুন করে চাল, চিনি, ডিম, পিয়াজের মতো কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।

কাওরান বাজারে ২৪ ঘণ্টাই দেখা বিক্রেতার সমাগম। দিনে-রাতে চলে পাইকারি ও খুচরা কেনা-বেচা। পণ্য সরবরাহে প্রতি রাতে এই বাজারে আসে কয়েকশ’ ট্রাক। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়, বৃদ্ধি পেয়েছে এসব ট্রাকের ট্রিপ খরচ। দূরপাল্লার প্রতি ট্রাকেই নেয়া হচ্ছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ এই ভাড়া ছাড়িয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এমনটাই দাবি করছেন আড়ৎদাররা।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে যে গাড়ি ভাড়া ছিল ১৭ থেকে ১৮ হাজার এখন সে গাড়ি ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, সরবরাহ খরচ বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পণ্যের দামেও পড়ছে। যেমন আলু পটোল টমেটো ও কাঁচামরিচ মোকাম থেকে পাইকারি আনতে কেজি প্রতি ১ থেকে ৫ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
এদিকে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও সংকট কাটেনি। ফলে দূরপাল্লার ট্রাকে কমেছে ট্রিপের সংখ্যা। এমনকি ট্রাক না পাওয়ার কারণের মোকামে পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ মিলছে।
ব্যবসায়ীরা বলেন, আমার গাড়ি পঞ্চগড় আটকে গেছে। আসতে পারেনি। ফলে পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। দূরপাল্লা ছাড়াও রাজধানীর আশপাশ অর্থাৎ সাভার নবাবগঞ্জ থেকে আসা পণ্যবাহী পিকআপ ও ছোট ট্রাকের ভাড়াও আগের তুলনায় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেড়েছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাঝারি চালের (বিআর-২৮ ও পায়জাম) কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। মোটা চাল (স্বর্ণা ও চায়না ইরি) ও সরু চালের (মিনিকেট) দাম কেজি প্রতি ১-২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৫৩ টাকায় বিক্রি হওয়া বিআর-২৮ জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা দরে। মানভেদে সরু চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে যা আগে ১ টাকা কমে পাওয়া যেতো হচ্ছে। মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা দরে।
সেগুনবাগিচার চাল বিক্রেতা মালেক খন্দকার বলেন, ট্রাক ভাড়া ৫ হাজার টাকা বাড়তি। ফলে পণ্য সরবরাহে খরচ বেড়ে গেছে। আমনের নতুন চাল বাজারে রয়েছে পাশাপাশি ভারত থেকেও চাল আমদানি হচ্ছে।
অন্যদিকে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ ছিল না। শুধু তেলের কারণে যে বাড়তি খরচ হচ্ছে এজন্য চালের দাম এক/দুই টাকা বেশি পড়ছে।

এ ছাড়া বাজারে চিনির দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি পাঁচ টাকা। প্রতি কেজি খোলা চিনি ১০৫ থেকে ১১০ টাকা বিক্রি হচ্ছে, যা ১০০ থেকে ১০৫ টাকা ছিল। আর প্যাকেট চিনির কেজি ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে দাম বেড়েছে পিয়াজেরও। বাজারে পিয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা দরে যা এক সপ্তাহ আগে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

ওদিকে বাজারে কমেছে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম। বাজার সোনালি মুরগি ৫০ টাকা কমে ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে ৪০০ থেকে ৪১০ টাকা ছিল। পাশাপাশি কেজিপ্রতি ১০-২০ টাকা কমেছে ব্রয়লার মুরগির দাম। বাজার ব্রলার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১১৫০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে।

শনির আখড়ার মরুগি বিক্রেতা আলমগীর বলেন, খামারে মুরগির ঘাটতি থাকায় ঈদের আগে হঠাৎ করে মুরগির দাম বেড়ে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় কেজিপ্রতি মুরগির দাম ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। সামনে দাম আরও কমতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রবিন হোসেন বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে মুরগির দাম বেশি ছিল আজ ৫০ টাকা কমে সোনালি মুরগি পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি সবজির দামও কমের মধ্যে রয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির পাওয়ায় সামনে হয়তো দাম বাড়তে পারে।

বাজারে করলা, পটোল বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে, ঢেঁড়স ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁকরোল ৮০ থেকে ১০০ ও আলু ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি সবজির দামই ২০ থেকে ৩০ টাকা কমেছে। এ ছাড়া টমেটো প্রতি কেজি ৬০-৭০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৬০ থেকে ৭০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৫০ টাকা, কচুর লতি প্রতি কেজি ৮০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি লক্ষ্য করা যায়। ২২০ টাকার নিচে বাজারে কোনো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। পাঙ্গাশ মাছ ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে তা বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকায়। ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৪০ থেকে ৩৭০ টাকা, যা গত তিনদিন আগেও বিক্রি হতো ৩০০ টাকা দরে। আর দুই কেজির চেয়ে বেশি ওজনের রুই মাছ ৩০ থেকে ৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকায়। এ ছাড়া তেলাপিয়া, পাবদা, শোল, টেংরাসহ সব মাছই কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে আজ বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। ক্রেতারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় বাজারদর বৃদ্ধি মানেই সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৩ শতাংশ আর মার্চ মাসে ছিল ৮.৭১ শতাংশ।