Image description

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এর ভিপি সাদিক কায়েম। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আলোচনায় আসা ছাত্রনেতাদের একজন। ওই সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে ডাকসুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হন। আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে অংশ নেওয়া নিয়ে তাঁর নাম আলোচনায় রয়েছে। সমসাময়িক ও আগামীর ছাত্ররাজনীতি নিয়ে কথা বলতে এশিয়া পোস্টের আয়োজন ‘আলাপন’—এ অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।

 

এশিয়া পোস্ট: আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা খাগড়াছড়ির মতো পাহাড়ঘেরা জনপদে। সেখান থেকে উঠে এসে এখন আপনি জাতীয় রাজনীতির অংশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই দীর্ঘ পথচলা ও ব্যক্তিগত বিকাশের অভিজ্ঞতা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

 

সাদিক কায়েম: আসলে আমার জন্ম হয়েছিল চট্টগ্রামের সাতকানিয়াতে, যেখানে আমার দাদা ও নানার বাড়ি। পরবর্তীতে বাবার ব্যবসার সুবাদে আমাদের খাগড়াছড়িতে থাকা শুরু হয়। আমার শৈশব ও স্কুল জীবন সেখানেই কেটেছে। এরপর দাখিল পরীক্ষা দিয়ে আমি চট্টগ্রামে ফিরে আসি এবং বায়তুশরফ মাদ্রাসা থেকে আলিম সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ছোটবেলা থেকেই আমি একটি অত্যন্ত বৈচিত্রময় পরিবেশে বেড়ে উঠেছি যেখানে সব ধর্মের ও নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ ছিল। আমার বাড়ির পাশেই ছিল হিন্দুদের ঘর, তার পাশেই রাখাইন পাড়া এবং সেখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করত। সেই বৈচিত্র্যের মধ্যেই কীভাবে ঐক্য গড়ে তুলতে হয়, তা আমি শৈশবেই শিখেছি। মাদ্রাসা থেকে ফিরে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা সবাই মিলে একসাথে খেলতাম কিংবা এলাকার যেকোনো প্রয়োজনে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতাম। পাহাড়ের সেই প্রতিকূল পরিবেশ আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে কঠিন মুহূর্তগুলো অতিক্রম করতে হয় এবং কীভাবে সংকটকালীন সময়ে সবাইকে সাথে নিয়ে নেতৃত্ব দিতে হয়। খাগড়াছড়িতে কাটানো সেই সময়গুলো আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। তৎকালীন ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আমরা স্কুল জীবন থেকেই আন্দোলন শুরু করেছিলাম। আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন থেকেই খাগড়াছড়ির রাজপথে আমরা সক্রিয় ছিলাম এবং তখন বিএনপি-জামায়াত জোটের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা আন্দোলন করেছি।

 

এশিয়া পোস্ট: তাহলে কি বলা যায়, আপনার ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই আপনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন?

 
 

 

সাদিক কায়েম: হ্যাঁ, আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই ছাত্রশিবিরের সমর্থক ও কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করি। সেই থেকেই আমার রাজনৈতিক পথচলার শুরু। পরবর্তীতে দুই হাজার চৌদ্দ, পনেরো এবং ষোলো সালের কঠিন দিনগুলোতে চট্টগ্রামে যখন ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে ছিল, তখন আমরা সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। চব্বিশের এই জুলাই বিপ্লব তো একদিনে সৃষ্টি হয়নি, এটি ছিল দীর্ঘদিনের এক পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আন্দোলনের ফসল। আমরা ছাত্রজীবনে বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছি।

 

এশিয়া পোস্ট: অল্প বয়সে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আপনার পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

 

সাদিক কায়েম: স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের পক্ষ থেকে এক ধরনের বাধা ছিল। যেকোনো সাধারণ পরিবারই চায় তাদের সন্তান নিরাপদ থাকুক এবং ঝুট-ঝামেলামুক্ত জীবনে অভ্যস্ত হোক। আমার পরিবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু আমি তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে দেশের স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত করতে তরুণদের লড়াই করা অপরিহার্য। তৎকালীন সময়ে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মতো জাতীয় নেতাদের একে একে হত্যা করা হচ্ছিল। সেই অন্যায় এবং শাপলা চত্বরের গণহত্যার প্রতিবাদে আমরা সবসময় রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। দীর্ঘ লড়াই এবং অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়েই আজ আমরা একটি স্বাধীন বাংলাদেশ ও নতুন সূর্য দেখতে পাচ্ছি।

 

এশিয়া পোস্ট: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আপনাকে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আপনার নিজের দৃষ্টিতে সেই আন্দোলনে আপনার ভূমিকা কী ছিল?

 

সাদিক কায়েম: আমি নিজেকে নায়ক হিসেবে পরিচয় দিতে চাই না। আমার কাছে এই বিপ্লবের প্রকৃত নায়ক হচ্ছেন আমাদের অকুতোভয় শহীদরা। তাঁদের আত্মত্যাগের ফলেই আজ দেশের মানুষ কথা বলতে পারছে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কার্যালয় খুলতে পেরেছে এবং বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার মতো নেতারা মুক্তি বা দেশে ফেরার সুযোগ পাচ্ছেন। আমি কেবল আন্দোলনের নীতি নির্ধারণ এবং মাঠ পর্যায়ের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছি। আমরা শুরু থেকেই চেয়েছিলাম এই আন্দোলনকে কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, বরং একটি সার্বজনীন রূপ দিতে। যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু, তাই আমরা দুই হাজার তেইশ সাল থেকেই বিভিন্ন পক্ষের সাথে ঐক্যের বিষয়ে কথা বলছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত তৎকালীন সময়ে বিভাজনের রাজনীতির কারণে সেই ঐক্য গড়ে ওঠেনি। কিন্তু দুই হাজার চব্বিশ সালের নির্বাচনের পর যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলো, তখন আমরা একে কোনো দলীয় ব্যানারে না রেখে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসি।

 

এশিয়া পোস্ট: আন্দোলনের উত্তেজনাপূর্ণ সময়গুলোতে আপনার নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও ভূমিকা কী ছিল?

 

সাদিক কায়েম: আন্দোলনের প্রতিটি ধাপই ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হলো এবং দেশে কারফিউ জারি করা হলো, তখন সামগ্রিক সমন্বয়ের কাজটি ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। ছাব্বিশে জুলাই যখন প্রথম সারির সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদদের ডিবি পুলিশ ঘিরে ফেলেছিল, তখন তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের সেফ হোমে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমি পালন করেছি। ইন্টারনেট না থাকায় মাঠের প্রকৃত তথ্যগুলো বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া ছিল দুরুহ কাজ। আমরা তখন পেনড্রাইভের মাধ্যমে গণহত্যার তথ্য ও ভিডিওগুলো সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দিতাম যেন সেগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। নয় দফা দাবি প্রণয়ন করা এবং সেগুলো প্রত্যেকটি মিডিয়া হাউসে পৌঁছানোর কাজটিও আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করেছি। কারণ অনেক সংবাদমাধ্যম সেই নয় দফাকে কাটছাঁট করে আট দফায় রূপান্তর করার চেষ্টা করছিল যেন প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি আড়ালে থাকে। আব্দুল কাদেরের ভিডিও বার্তা এবং আমাদের আন্দোলনের প্রতিটি আপডেট যেন মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়ে আমরা নিরলস কাজ করেছি।

 

এশিয়া পোস্ট: সারা দেশের সমন্বয়কদের সঙ্গে দ্রুত ও কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখতে আপনি কী ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন?

 

সাদিক কায়েম: ছাত্ররাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কারণে সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সাথে আমার আগে থেকেই সুসম্পর্ক ছিল। আমি তাদের কাছে যখন তথ্য পৌঁছাতাম, তখন তারা আমার তথ্যের নির্ভুলতা দেখে আমার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেছিল। আন্দোলনের কৌশলের স্বার্থে আমি অনেক সময় নিজের পরিচয় সরাসরি না দিয়ে সালমান নাম ব্যবহার করে অনেকের সাথে যোগাযোগ করেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল আন্দোলনকে সফল করা এবং মানুষের অধিকার আদায় করা।

 

এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য সরকার কাঠামো নিয়ে আপনাদের মধ্যে কী ধরনের আলোচনা বা পরিকল্পনা ছিল?

 

সাদিক কায়েম: পাঁচই আগস্টের অনেক আগে থেকেই আমরা পরবর্তী রূপরেখা নিয়ে কাজ করছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম একটি জাতীয় বা বিপ্লবী সরকার যেখানে সব পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব থাকবে। চারই আগস্ট যখন আওয়ামী লীগের পেটোয়া বাহিনী রাজপথে অস্ত্র নিয়ে হামলা করছিল, তখন আমি এবং অন্যান্যরা মিলে সিদ্ধান্ত নিই যে আর কালক্ষেপণ করা যাবে না। তখনই আমরা মার্চ টু ঢাকার কর্মসূচি একদিন এগিয়ে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করি। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। কে কোথায় বসেছে বা কার ছবি সামনে এসেছে, সেগুলো আমাদের কাছে কখনোই মুখ্য ছিল ছিল না।

 

এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনের কোন মুহূর্তটি আপনার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে?

 

সাদিক কায়েম: উনিশই জুলাই শুক্রবার যখন ইন্টারনেট হঠাৎ চলে গেল এবং সবকিছু ডিসকানেক্টেড হয়ে গেল, সেই সময়টা খুব স্পর্শকাতর ছিল। মিডিয়া তখন মিথ্যাচার করছিল যে শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে ফিরে গেছে। ওই সময়ে আন্দোলন যে অব্যাহত আছে তা ঘোষণা করা সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল। প্রথম সারির সমন্বয়কদের পাওয়া যাচ্ছিল না, সবার অফলাইন নাম্বার বন্ধ ছিল। ওই সময়ে নয় দফা প্রণয়ন করে মিডিয়ায় পৌঁছে দেওয়া ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন। নয় দফার প্রথম দফায় ছাত্র হত্যার দায় নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার শর্ত দেওয়ার মানেই ছিল প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করা। এছাড়া আঠারই জুলাই ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউটের পর যখন আমরা যাচ্ছিলাম, তখন হেলিকপ্টার থেকে গুলি হচ্ছিল। আমার পাশেই অনেকে আহত হয়েছে। শত শত বিপ্লবীর মৃত্যু এবং তাঁদের পঙ্গু হওয়ার সেই চিত্রগুলো ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ।

 

এশিয়া পোস্ট: আপনার দৃষ্টিতে এই আন্দোলনের প্রকৃত মাস্টারমাইন্ড কারা ছিলেন?

 

সাদিক কায়েম: মাস্টারমাইন্ড ছিল শহীদরা এবং গাজীরা। এর বাইরে কোনো মাস্টারমাইন্ড নেই। এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সাহায্য। আবু সাঈদ, আলী রায়হান ও শান্তরা জীবন দিয়ে রাস্তা দেখিয়েছে। তারা একটি নতুন বাংলাদেশ এবং বৈষম্যহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মাণের জন্য জীবন দিয়েছে।

 

এশিয়া পোস্ট: সমন্বয়কদের মধ্যে বর্তমানে যে দূরত্ব বা মতপার্থক্যের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, সেটিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?

 

সাদিক কায়েম: এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক। বিশেষ করে যাঁরা ছাত্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে সবাইকে ধারণ করার মানসিকতার অভাব ছিল। তাঁরা যদি সবাইকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতেন এবং সংকীর্ণতা পরিহার করতেন, তবে আজ এই বিভেদ সৃষ্টি হতো না। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা জুলাইয়ের স্পিরিট ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশের সাথে আপোষ করেছেন।

 

এশিয়া পোস্ট: ডাকসুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর আপনি শিক্ষার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা পূরণ করতে পেরেছেন?

 

সাদিক কায়েম: আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর এক মুহূর্তের জন্য বিশ্রাম নিইনি। গত চার মাসে আমরা দুই শত পঁচিশটিরও বেশি কাজ সম্পন্ন করেছি। এক শত চার বছরের ইতিহাসে যা হয়নি, সেই অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য সন্ধ্যাকালীন বাস সার্ভিস আমরা চালু করেছি। মেডিকেল সেন্টারের সংস্কার, কেন্দ্রীয় মসজিদের আধুনিকায়ন এবং হলের খাবারের মান উন্নয়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা এবং ডাকসুকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের আওতায় নিয়ে আসা আমাদের অন্যতম বড় অর্জন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং বাজেটের সীমাবদ্ধতা আমাদের অনেক কাজকে মন্থর করে দিচ্ছে।

 

এশিয়া পোস্ট: ডাকসু ভিপি পদ ব্যবহার করে কি ছাত্রশিবিরকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন?

 

সাদিক কায়েম: না, একজন স্টুডেন্টও বলতে পারবে না যে আমি আমার পদ ব্যবহার করে কারো অধিকার হরণ করেছি। আমি শিক্ষার্থীদের ভাই হিসেবে তাঁদের পাশে থাকতে চাই। ক্যাম্পাসে আমি শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করিনি। প্রতিটি প্রোগ্রামে আমি সকল ছাত্র সংগঠনকে দাওয়াত দিই। কিন্তু কেউ যদি শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হতে ভয় পায় এবং না আসে, তবে সেই দায় ডাকসুর নয়।

 

এশিয়া পোস্ট: অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত থাকার পেছনে কী কারণ দেখছেন?

 

সাদিক কায়েম: এটা খুবই অপ্রত্যাশিত। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পরেও বিএনপি আইনজীবীদের মাধ্যমে রিট করে তা বন্ধ করে দিয়েছে। তারা সম্ভবত শিক্ষার্থীদের রায়কে ভয় পাচ্ছে এবং তাদের ওপর জনগণের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। আমরা চাই প্রতিটি ক্যাম্পাসে নিয়মিত নির্বাচন হোক এবং নতুন নেতৃত্ব উঠে আসুক।

 

এশিয়া পোস্ট: বিগত সতেরো বছরের গোপন রাজনীতি আর এখনকার প্রকাশ্য রাজনীতির পার্থক্য কেমন দেখছেন?

 

সাদিক কায়েম: গত ষোল বছরে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ওপর ইতিহাসের বর্বরোচিত জুলুম হয়েছে। পরিচয় পেলেই মামলা, হামলা ও গুম করা হতো। গুম কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী একত্রিশ শতাংশ গুমের শিকার হয়েছে শিবিরের কর্মীরা। স্ট্র্যাটেজিক কারণে আমরা তখন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে কাজ করতে পারিনি, কিন্তু সকল আন্দোলনে রাজপথে ছিলাম। মিডিয়া তখন আমাদের কাজগুলো প্রচার করেনি বরং আমাদের ওপর এক ধরনের অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয়েছে। আজ জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ছাত্রশিবির তার অধিকার ফিরে পেয়েছে।

 

এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

 

সাদিক কায়েম: সরকার জুলাই বিপ্লবকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করতে পারেনি এবং তারা আপোষ করেছে। বিএনপি প্রকাশ্যে জাতির সাথে দ্বিচারিতা করছে। সত্তর শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও তারা তা অস্বীকার করছে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নিচ্ছে না। তারা বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিল করে দলীয়করণের চেষ্টা করছে। এটি শহীদদের রক্তের সাথে সুস্পষ্ট প্রতারণা।

 

এশিয়া পোস্ট: গুঞ্জন উঠেছে আপনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করবেন। এটার সত্যতা জানতে চাই।

 

সাদিক কায়েম: এটা জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। জনগণের পক্ষ থেকে প্রত্যাশা ও আগ্রহ আসছে। যদি তারা চায়, তবে সেই ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেব। নির্বাচিত হলে ঢাকাকে একটি পরিকল্পিত ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তোলাই হবে আমার মূল লক্ষ্য।

 

এশিয়া পোস্ট: বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের জন্য আপনার কী বার্তা থাকবে?

 

সাদিক কায়েম: আগামী দিনের বাংলাদেশ পরিচালিত হবে এই প্রজন্মের তরুণদের মাধ্যমে। তারা এখন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর প্রতিটি স্তরে অংশ নিতে শুরু করেছে। মুরুব্বি জেনারেশন অনেক সময় ক্ষমতার মোহে পুরনো কাঠামো ধরে রাখতে চাইলেও তরুণরাই দেশে প্রকৃত ইনসাফ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। জুলাইয়ের যে চেতনা নিয়ে তরুণরা রাজপথে নেমেছিল, সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যাবে বলেই আমি বিশ্বাস করি।

 

এশিয়া পোস্ট: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।