Image description

কেউ যদি উত্তরাধিকারসূত্রে বাবার কাছ থেকে এক টাকা মূল্যের সম্পদও পান, ওই সম্পদেরও কর দিতে হবে। আর এই আইন হতে যাচ্ছে আসছে বাজেটে। এটি বাস্তবায়িত হলে পথের ভিখারি আর বাস্তুহীন ছাড়া যিনি এই সম্পদের অধিকারী হবেন, তাঁকেই কর দিতে হবে। তবে ভিক্ষুকও যদি বাবার উত্তরাধিকারী হিসেবে অন্তত এক টাকার বেশি সম্পদ পান, ভিক্ষুক হলেও তিনিও মাফ পাবেন না; তাঁকেও দিতে হবে কর।

এ ছাড়া কৃষক-শ্রমিক কিংবা দিনমজুর—কেউই মাফ পাবেন না, যদি তাঁরাও উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পদ পান। তাঁদেরও দিতে হবে কর। বলা যায়, এই আইনের মাধ্যমে গণহারে করের খড়্গ চাপানোর পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এমন প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি।
 
এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। নিকটাত্মীয় ও দূরসম্পর্কের আত্মীয়। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, নিকটাত্মীয় বলতে বোঝাবে মা, বাবা, আপন ভাই বা বোনের কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদ।

অন্যদিকে এর বাইরে যেকোনো ব্যক্তির কাছ থেকে সম্পদ পেলে তা দূরসম্পর্কের আত্মীয় বলে বিবেচিত হবে। নিকটাত্মীয় হলে প্রাপ্ত সম্পদের ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর নির্ধারণ করা হতে পারে। অন্যদিকে দূরসম্পর্কের আত্মীয় হলে এই হার ৩ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

তবে এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য একটি সীমা নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। উত্তরাধিকারসূত্রে যেকোনো ধরনের প্রাপ্তির পরিমাণ এক টাকার নিচে হলে সেই টাকার ওপর কোনো কর দিতে হবে না।

তবে টাকার পরিমাণ এক টাকা হলেই দিতে হবে কর। এই পরিমাণ যত বাড়তে থাকবে, করের পরিমাণও তত বাড়বে।

জানা গেছে, নিকটাত্মীয়ের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার কর এক টাকা থেকে শুরু করে এক কোটি টাকার ওপর ১ শতাংশ। পরবর্তী পাঁচ কোটি টাকায় ২ শতাংশ। সেই হিসাবে ছয় কোটি টাকায় ২ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। এরপর আরো পাঁচ কোটি টাকার ওপর (মোট ১১ কোটি টাকা হলে) ৩ শতাংশ কর দিতে হবে। এর চেয়ে বেশি যেকোনো পরিমাণ টাকার সমমূল্যের সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে পেলে সেই টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

অন্যদিকে দূরসম্পর্কের আত্মীয়র কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এক টাকা থেকে শুরু করে এক কোটি টাকা পর্যন্ত পেলে সেই টাকার ওপর ৩ শতাংশ কর দিতে হবে। পরবর্তী পাঁচ কোটি টাকার ওপর (মোট ছয় কোটি টাকা) ৫ শতাংশ কর দিতে হবে। এর পরের পাঁচ কোটি টাকায় (মোট ১১ কোটি টাকা) কর দিতে হবে ৭ শতাংশ। এর পরের ধাপে আরো পাঁচ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের জন্য ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে সরকারের কোষাগারে। সেই হিসাবে ১৬ কোটি টাকা হলেই ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

এই দুটি হিসাবই হবে বর্তমান বাজারমূল্যে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারা যাওয়ার আগে একজন বাবার সম্পদের পরিমাণ ১০ লাখ টাকা। তিনি এই সম্পদ বিক্রি না করায় তাঁর কর নথিতে এই সম্পদের দাম বাড়েনি। তবে তিনি মারা যাওয়ার পর দেখা গেল, সম্পদের বাজারমূল্য এক কোটি টাকা। এখন তাঁর এই সম্পদ তাঁর ছেলে বা মেয়ে পাওয়ার সময় তাঁকে ১ শতাংশ হারে এক লাখ টাকা কর দিতে হবে। এই মৃত ব্যক্তির যদি তিনজন বা চারজন সন্তানও থাকেন, তাহলে তাঁদের ভাগে প্রাপ্ত সম্পদের ওপরই নির্দিষ্ট হারে কর দিতে হবে।

এনবিআরের করনীতি বিভাগের সাবেক সদস্য ড. সৈয়দ আমিনুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেকোনো কিছু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট মান (থ্রেশহোল্ড) থাকা উচিত। উত্তরাধিকারসূত্রে এক টাকা পেলেও তার ওপর কর দিতে হবে—এমনটা হলে একজন কৃষককেও কর দিতে হবে। এখন গরিব মানুষেরও বাজারমূল্যে কোটি টাকার ছোটখাটো সম্পদ থাকে। এটা হলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই একটা থ্রেশহোল্ড তৈরি করা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এলাকাভিত্তিক পাইলটিং করা যেতে পারে। যেসব জায়গায় সম্পদের দাম অনেক বেশি, সেগুলো নেওয়া যেতে পারে। সারা দেশে একযোগে এমন পদক্ষেপ ভালো হবে না। প্রাথমিকভাবে কৃষিজমিকে এর আওতার বাইরে রাখলেই ভালো হয়।’

আয়কর আইন-২০২৩ অনুযায়ী, বর্তমানে ন্যায্য বাজারমূল্য নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নেই। সে ক্ষেত্রে আয়কর বিভাগের একজন উপ-কর কমিশনার এই বাজারমূল্যের পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। তবে এখানে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ থেকে যায় বলে মনে করছেন ড. সৈয়দ আমিনুল করিম। তিনি বলেন, ‘এতে উপ-কর কমিশনারের মাধ্যমে একটা হয়রানির সুযোগ হবে।’

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উত্তরাধিকার কর নিয়ে আমরা কাজ করছি। এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যানও বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদে কর আরোপ করে।’ ন্যায্য বাজারমূল্য নির্ধারণে উপ-কর কমিশনারের এখতিয়ারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি নিয়েও কাজ চলছে। এটার পরিবর্তন হতে পারে।’

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, বেলজিয়াম, স্পেনসহ বেশ কিছু দেশ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর কর আরোপ করেছে। তবে ২০০৫ সালে সুইডেন এবং ২০১৪ সালে নরওয়ে উত্তরাধিকার কর বাতিল করেছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের যেসব দেশ তারা জিডিপির প্রায় ০.১৫ শতাংশ পর্যন্ত টাকা এই কর থেকে আদায় করে। সেই হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপির আকার অনুযায়ী সরকার অতিরিক্ত কর পেতে পারে প্রায় সাত হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামিম আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষজন এখনো উত্তরাধিকার করের সঙ্গে অভ্যস্ত না। তাই এই কর বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা উচিত। উন্নত দেশগুলোর সরকার প্রত্যক্ষ কর থেকে অনেক টাকা আদায় করে। কিন্তু আমাদের আদায়ের বড় অংশ পরোক্ষ কর। দেশের কর আদায় বাড়ানোর জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সম্পদশালীরা সম্পদের বিপরীতে সারচার্জ দিচ্ছে, যদিও এটা তার মূল করের বাইরে। তাই এখানে দ্বৈত করের প্রশ্ন থেকে যায় কি না তা দেখা উচিত।’

বাজারমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে উপ-কর কমিশনারের এখতিয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সম্পদ হিসাবের একটা নির্ভরযোগ্য ফ্রেমওয়ার্ক থাকতে হবে। একেবারে কোনো একটা কর্তৃপক্ষের ওপর ছেড়ে না দিয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। তা না হলে স্বেচ্ছাচারিতার জায়গা থেকে লেনদেনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এই জায়গাটা বিজ্ঞানভিত্তিক করতে হবে।’