প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর ধরে শাসন করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লাল ঝান্ডার ৩৪ বছরের রাজত্ব ২০১০ সালে মমতাঝড়ে হয়ে গিয়েছিল লন্ডভন্ড। তবে সেই শক্তিশালী মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থা এখন আর আগের মতো নেই!
কাল বাদে পরশু নির্বাচন। মমতা যিনি এই রাজ্যে ‘দিদি’ হিসেবে পরিচিত, তিনি আবার জিতবেন কি না— এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন, নানা সংশয়। দলের ভেতরে যেমন, দলের বাইরেও। আর জনতার মধ্যে তো আছেই।
দিদির সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিতে এবার কোমরবেঁধে মাঠে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি।
পাঁচ বছর আগের নির্বাচনে বিজেপি জিতেছিল ৭৭ আসনে। এবার তাদের প্রত্যাশা ১৭৭। এদের সংসদ নির্বাচনকে বলা হয় রাজ্য বিধানসভার ভোট। গতবার বিধানসভায় দিদি ২১৩ আসনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। মোট বিধানসভার আসন ২৯৪। ১৪৮ আসনে জিতলেই সরকার গঠনের সুযোগ।
কলকাতা বিমানবন্দর থেকে আধাঘণ্টার ড্রাইভে নিউ টাউন যাওয়ার পথে কোনো স্পটে নির্বাচনী ব্যানার কিংবা পোস্টার চোখে পড়েনি। সভা-সমাবেশ বা মিছিল কোনোটাই নেই।
একটু অবাক হতে হলো। মধ্যমগ্রামের কার ড্রাইভার জয়কে জিজ্ঞেস করলাম, ভোটের কি খবর? ‘১৭ বছর ধরে গাড়ি চালাই। আগে এত ঝামেলায় পড়িনি কখনো। এখন কারণে-অকারণে ঠুকে দেয় ট্রাফিক মামলা। জরিমানা গুনতে হয়। রাজ্যে টাটাকে কারখানা বানাতে দেয়নি দিদি। ব্রিটানিয়া বিস্কুট কোম্পানিও গুটিয়ে নিয়েছে। বাড়ছে বেকারত্ব। এত বছর ক্ষমতায়। কেয়ার করছে না কোনো কিছুই। এবার একটু পরিবর্তন দরকার।’
অবশ্য দিদির পক্ষেও আছে পাল্টা যুক্তি। মেদেনীপুর গ্রাম থেকে কলকাতা নগরীতে ফিরেছেন গোপাল। তার বিশ্বাস ‘এবারও দিদি জিতবেন। তবে বিজেপির সঙ্গে ভোটার আর বিধায়কের ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে মোদির দল। কারণ প্রচুর দুর্নীতি হয়েছে এই কয়েক বছরে। কিন্তু দিদির একটা প্লাস পয়েন্ট হলো নগদ টাকা। রাজ্য সরকার থেকে গ্রামের নারী ও ইন্টার পাস বেকার যুবকদের মাসে দেড় হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। গ্রামের প্রান্তিক মানুষের কাছে এই নগদ অর্থ অনেক কিছু। দুর্নীতি হলো কি না, উন্নয়ন পিছিয়ে গেছে কি না— এসব তাদের বিবেচনায় থাকে না।’
মমতার নগদ টাকার কৌশল যে ভোটের রাজনীতিতে ফলদায়ক, সেটা বুঝতে শুরু করেছে বিজেপিও। এবার বিজেপি রাজ্য সরকার গড়তে পারলে নারীদের মাসিক ভাতা দ্বিগুণ করে ৩ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মোদি এরই মধ্যে পাঁচবার ঘুরে গেছেন পশ্চিমবঙ্গে।
ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ। নারী-পুরুষ ভোটারের সংখ্যার ব্যবধান মাত্র ১৬ লাখ। ৩ কোটি ৪৯ লাখ পুরুষ আর ৩ কোটি ৩৩ লাখ নারী।
ডিসাইডিং ফ্যাক্টর তাহলে কী? নারী ভোটার নাকি মুসলিমরা? তাদের সংখ্যাটা জেনে নেওয়া যাক। ১ কোটি ৮০ লাখ। মুসলিম ভোট দিদির পকেটে। তার কিছুটা ধারণা মেলে বিমানবন্দর সড়কে হজযাত্রীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে শয়ে শয়ে ফেস্টুন লাগানোর দৃশ্য দেখে।
এ রকম সহজ সমীকরণে তো আর ভোটে জেতা যায় না। সংকট যে মমতার দলে দেখা দিয়েছে, সেটা জানা গেল শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রয়েছে এমন একজনের কাছ থেকে। সেলিব্রিটি এই খেলোয়াড়ের ধারণা, ‘বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে দেশান্তরী হওয়াদের পক্ষে আইন পাস করেছে মোদি সরকার। এবার তাদের বিবেচনা করা যেতে পারে।’
মমতার তৃণমূলকে নিয়ে আরও বেশি দ্বিধা তার দলের নেতাদের মধ্যে, ‘ডিজিটাল প্রচারের দায়িত্ব আইপ্যাককে দিয়ে কতটা সঠিক হলো?’ আইপ্যাক হলো বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, যারা বিভিন্ন রাজনীতিক দলের জন্য নির্বাচন কৌশল, জনমত সমীক্ষা, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার পরিকল্পনা করে থাকে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের একজন কলকাতা টিভির গৌতম ভট্টাচার্য এ রকম একটি ব্যাখ্যা দিলেন, ‘এবার কিছুটা দ্বিধা কাজ করছে তৃণমূল নেতাদের মধ্যেও। না জিতলে দলের ভেতরে বাইরে সমালোচনা অবধারিত।’
ভোটের ডিসাইডিং ফ্যাক্টর কী হবে এবার— এই প্রশ্নের উত্তরে সামনে এসে গেছে অনেকগুলো বিষয়। মুসলিম ভোট কে বেশি টানতে পারছে , প্রায় এক কোটি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া, অতিরিক্ত সেন্ট্রাল ফোর্স— মানে আড়াই লাখ সেনা কলকাতা নিয়ে আসা, নাকি দিদির দলের দুর্নীতি, উন্নয়নে পিছিয়ে থাকার মতো ইস্যুগুলো।
দুই দফা ভোট শেষে (২৩ ও ২৯ এপ্রিল) ৪ মে ফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত এই আলোচনাই প্রাধান্য পাচ্ছে, দিদি কি তবে হারতে যাচ্ছেন? অথচ আগের নির্বাচনে এ রকম নেতিবাচক কথা চালু ছিল না। তাহলে কি মমতার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে?
১৫ বছর আগে যেই দিদি ৩৪ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় থাকা সিপিএমকে নাই করে দিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন, সেই তিনি এখন ক্ষমতার রাজনীতিতে নাই হয়ে যাবেন! এ তথ্যও জানা আছে গত বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় রাজনীতির চাণক্য কংগ্রেস ও সিপিএম কিন্তু একটি আসনও পায়নি।