ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) যেতে শিক্ষার্থীরা বাসা থেকে বের হয়ে প্রায়ই জানতে পারেন, নষ্ট হওয়ায় আজ বাস আসবে না। তখন ক্লাস ধরতে তড়িঘড়ি করে অন্য যানবাহনে ছুটতে হয়। আবার অনেক সময় যাত্রাপথে বিকল হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস। ফলে মাঝপথে নেমে শিক্ষার্থীদের বিকল্প পন্থায় যেতে হয়।
সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য বিআরটিসি পরিচালিত ৬০টি বাসের একটিরও ফিটনেস নেই। কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত এসব বাসে চলাচল করছেন। অথচ ফিটনেসবিহীন এসব বাসের বিষয়ে কিছুই জানে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, ফিটনেস সনদবিহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ সনদ ব্যবহার করে কোনো মোটরযান সড়কে চলাচল করতে পারবে না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিআরটিসি পরিচালিত বাসগুলোর বেশির ভাগের ফিটনেস সনদের মেয়াদ অন্তত ছয় বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য ২০০৯ সালে বিআরটিসির কল্যাণপুর ডিপোর সঙ্গে চুক্তি করে ঢাবি। চুক্তি অনুযায়ী বর্তমানে ৬০টি বাস বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। কল্যাণপুর বাস ডিপো থেকে যে ৬০টি বাস ঢাবির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর একটি তালিকা কালের কণ্ঠের কাছে রয়েছে।
সরেজমিনে কয়েকটি বাস ঘুরে দেখা গেছে, অনেক বাসের দরজায় হাতল নেই। অনেকটি বাসের দোতলায় ওঠার সিঁড়ির হাতল ভাঙা। বাসের সিটের ওপর যে ফ্যান রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগ বিকল। নেই সিটের কাভার। আবার সিটগুলোর বেশির ভাগ নড়বড়ে। হাত দিয়ে টান দিলে পুরো সিট সরে যায়। জানালার কাচও ভাঙা।
ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন শিক্ষার্থীরা :ম রামপুরা রুটে ঢাবির বাস বসন্তে যাতায়াত করা পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী জাওয়াদ হোসেন আবির বলেন, ‘আমাদের রুটে বর্তমানে চারটি আপ ও ছয়টি ডাউন ট্রিপ চলমান। বাসগুলোর কন্ডিশন খুব খারাপ। বেশ কয়েকটা বাসে নেই পর্যাপ্ত ফ্যান। মাঝেমধ্যেই ফ্লাইওভারে উঠতে গিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তায় ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বেশির ভাগ বাসের জানালার গ্লাস ভাঙা, সিট ভাঙা। সিটের অনেক জায়গায় পেরেক বের হয়ে আছে। গেটের অনেক জায়গায় কাঁটা লোহা বের হয়ে আছে। প্রায়ই ব্রেক কষলে শিক্ষার্থীরা পড়ে যান। অনেক বাসের দোতলায় ওঠার সিঁড়ি ও হাতল ভাঙা।’
কমলাপুর রুটে যাতায়াত করা ‘কিঞ্চিৎ’ বাস কমিটির সাবেক সভাপতি ও ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ বায়েজিদ বলেন, ‘একে তো বাসের ট্রিপসংখ্যা অপ্রতুল, এর ওপর বাসের ফিটনেস আরেকটি বড় সমস্যা। বেশির ভাগ বিআরটিসির ভাঙাচোরা বাস মনে হয় ঢাবিকে দেওয়া হয়েছে।’
মুগদাপাড়া রুটে যাতায়াত করা আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সাদ আরমান নাফিস বলেন, ‘ঢাবির বহু বাস দীর্ঘদিন ধরে ফিটনেসবিহীন অবস্থায় চলাচল করছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য চরম ভোগান্তির। যান্ত্রিক ক্রটির অজুহাতে প্রায়ই বাতিল হয় নির্ধারিত ট্রিপ। ফলে ক্লাস ও পরীক্ষায় সময়মতো পৌঁছানো যায় না। ভাঙা ও ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশের আঘাতে যাত্রাপথে প্রায়ই শিক্ষার্থীরা আঘাতপ্রাপ্ত হন। বলা চলে চরম দুর্বিষহ অবস্থায় আমাদের চলাচল করতে হচ্ছে।’
প্রশাসন যা বলছে : ফিটনেসবিহীন বাসে কেন শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়া করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাবির পরিবহন ম্যানেজার কামরুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের যে পরিমাণ বাসের চাহিদা, তা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেই। চুক্তির কারণে আমাদের এক জায়গা থেকেই বাস আনতে হচ্ছে। আমরা বিআরটিসির সঙ্গে বসে ডিপো বিকেন্দ্রীকরণ করতে চাচ্ছি। তাতে আমাদের একটি ডিপোর ওপর নির্ভর করতে হবে না। তখন বিভিন্ন ডিপোর ভালো ভালো বাস পাওয়া যাবে। তবে বিআরটিসি আমাদের জানিয়েছে, তাদের এই বাসগুলোর ফিটনেসের মেয়াদ আছে। আমরা তাদের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানব।’
ডাকসুর ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে বিআরটিসির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, বাসগুলো শুধু কল্যাণপুর ডিপো থেকে নেওয়া হয়। এর ফলে একটি মাত্র ডিপো থেকে বাস নেওয়ার কারণে অনেক ফিটনেসবিহীন বাস আমাদের ব্যবহার করতে হচ্ছে। আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। আমরা দাবি জানিয়েছি, কল্যাণপুর ডিপোকে ডি-সেন্ট্রালাইজ করে আরো কিছু ডিপো—যেমন মতিঝিল, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিআরটিসির অন্যান্য ডিপো সংযুক্ত করা হোক। তাহলে ভালো ফিটনেসসম্পন্ন বাস বাছাই করে নেওয়া সম্ভব হবে।’
ঢাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিআরটিসির সঙ্গে বাসের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বসেছি, সামনেও বসব। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে উন্নতমানের বাস আনার ব্যবস্থা করা হবে।’ নতুন বাস কেনার ক্ষেত্রে সরকারের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাস কেনার বিষয়ে যে নিষেধাজ্ঞা আছে, সে জন্য সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে শিক্ষার্থীদের জন্য যে বাস দরকার সেখানে যদি নিষেধাজ্ঞা না থাকে তাহলে আমরা নতুন কিছু বাস কেনার বিষয়ে আগ্রহী।’
বিআরটিসির বক্তব্য : বিআরটিসির প্রশাসন ও অপারেশন পরিচালক (যুগ্ম সচিব) রাহেনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্ট আছে, আমাদের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা প্রতিনিয়ত গাড়িগুলো চেক করেন। আমাদের গাড়িগুলা টেকনিক্যালি ফিট। কিন্তু কাগজ-কলমে ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স পরিশোধ না করার কারণে।’