শনিবার রাত তখন প্রায় ১১টা। অফিস থেকে বের হওয়ার পর মনে পড়লো বাইকে তেল নেই। প্রায় দিন দশেক আগে কয়েক ঘণ্টা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে ৪ লিটার তেল নিতে পেরেছিলাম। এখন বাসায় যাবো কি করে আর পরদিন অফিস অ্যাসাইনমেন্টেই কীভাবে যাবো? তাই রিজার্ভে যতটুকু তেল বাকি ছিল তাই নিয়েই রাজধানীর বিভিন্ন ফুয়েল পাম্পে ঢুঁ মারতে থাকি। মনে ভয়ও ছিল কখন জানি মোটরসাইকেল বন্ধ হয়ে যায়! তবে কিছুই করার ছিল না। পাম্প খুঁজতে খুঁজতে রিজার্ভও প্রায় শেষ। তেল লাগবেই। এরই মধ্যে মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকায় হঠাৎ ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। অনেক চেষ্টার পরও কোনোভাবেই বাইক চালু হলো না। সেখান থেকেই বাইক ঠেলে রওনা দিলাম তেজগাঁওয়ের দিকে। উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংলগ্ন ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন। কিন্তু সে পর্যন্ত যাওয়ার আগেই চক্ষু চড়কগাছ। পেছাতে পেছাতে দেখি আড়াই কিলোমিটারের দীর্ঘ লাইন গিয়ে ঠেকেছে মহাখালী রেলগেট। এরই মধ্যে দেখি পাম্পে আসা মানুষের এই ভোগান্তির খবর প্রচারে বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালের সংবাদকর্মীরাও সেখানে এসেছেন। সহকর্মীদের দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। ভাবলাম- অন্তত সঙ্গ দেয়ার কেউ তো আছে।
এরই মধ্যে কেউ কেউ বলছিল, সাংবাদিকদের তো অনেক পাম্পেই অগ্রাধিকারভিত্তিতে তেল দেয়া হচ্ছে। তা আপনি বসে আসেন কেন? তখন আমিও পাম্প কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি, যদি একটু সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু সে গুড়েবালি। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানালেন, এরকম কোনো ব্যবস্থা নেই। তেল নিতে হলে লাইনে দাঁড়াতে হবে। কি আর করার। গাড়ি চালাতে হলে তেল লাগবে। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যে বাইক ঘুরিয়ে বাসায় চলে আসবো সেই উপায়ও নেই। তাই বাইকটি ঠেলে আড়াই কিলোমিটার ঘুরে মহাখালী রেলগেটে লাইনের শেষে গিয়ে দাঁড়ালাম। ততক্ষণে পুরো শরীর ঘামে ভিজে একাকার। শত শত বাইকারের লাইন। যেতে যেতে অন্য বাইকারদের সঙ্গে নানা কথা শুরু হলো। শুরু হলো দীর্ঘ অপেক্ষার। ভাবলাম, তিন-চার ঘণ্টার মধ্যেই হয়তো তেল পেয়ে যাবো। এরপর বাসায় গিয়ে ঘুম দিবো। কিন্তু খুব দ্রুতই আমার সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়ে গেল। সামনে-পেছনের বাইকারদের কাছ থেকে জানতে পারলাম- তেল পেতে পরদিন বিকাল ৪টাও বাজতে পারে।
এরই মধ্যে সামনে-পেছনের বাইকারদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল আজিজ সাহেব, রিজভী আহমেদ ও রাজীব নামে একজনের সঙ্গে। রাজীব আমার সাংবাদিক পরিচয় জেনে নিজের জীবনের গল্প বলতে শুরু করলেন। তিনি একসময় ফুটবলার ছিলেন। আশির দশকের জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলেছেন। কিন্তু জীবনের নানা টানাপড়েনে সেই পথে টিকে থাকতে পারেননি। এখন ঢাকায় ব্যাচেলর হিসেবে থাকেন। আমি তাদের কথা বুদ হয়ে শুনছিলাম। ভালোই লাগছিল একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। সময়ও কেটে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে শুরু হলো তুমুল রাজনৈতিক আলোচনা। প্রসঙ্গ জ্বালানি তেল। এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখেননি, বলছিলেন তারা।
‘পর্যাপ্ত তেল মজুত আছে, তেলের কোনো সংকট নেই’ সরকারের জ্বালানি মন্ত্রীর এ বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে রাজীব বললেন, ‘তেল মজুত থাকলে লাভ কী, যদি আমরা না পাই?’ এভাবে চলতে চলতে প্রায় রাত ৩টা বেজে গেল। এদিকে ক্ষুধাও বাড়ছিল। আমদের লাইনের পাশেই ভাসমান চা-শিঙাড়ার দোকান ঘুরছিল। শিঙাড়া, চা আর পানি খেয়ে নিলাম। সাড়ে তিনটার দিকে আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের গোড়ায়। তখন রাস্তাটি দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের দখলে। একেতো মশা, চোখে ঘুম নেই এরপর ধুলাবালিতে চোখ-মুখ একাকার। ঘড়ির কাঁটা চলতে থাকে কিন্তু লাইন এগোয় না। এরই মধ্যে রাত ৪টা বেজে গেল। ঘুমে চোখ বুজে আসছিল। দেখলাম- বিএফ শাহীন কলেজের বিপরীতে ফুটপাথের টং দোকানের বেঞ্চে অনেক বাইকার কিছুটা বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু প্রচণ্ড মশার কামড় বারবার ডেঙ্গুর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
রাত জাগা ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন বাইকের ওপর শুয়ে বিশ্রামের চেষ্টা করছি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল ৬টা। অনেকেই তখন ঘুমে। আমারও তখন ক্লান্তি চেপে বসেছে। আড্ডা থেমে গেছে। চারিদিকে সুনসান অবস্থা। ঘুমের তন্দ্রা ভেঙে দেখি সকাল ৮টা। আমরা তখন জাহাঙ্গীর গেট এলাকায়। এরই মাঝে দিনের তীব্র গরমে সবাই জেগে উঠলো। ভাসমান হকাররা তখনও নাস্তা নিয়ে ঘুরছে আমাদের লাইনের পাশে। কিন্তু গাড়ি রেখে কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। রোদ বাড়তে থাকে। কষ্টও বাড়ে। শরীর ঘামে ভিজে একাকার। ফ্রেশ হওয়ার কোনো উপায় নেই। পাম্পের ওয়াশরুম প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। সেখানে গেলে লাইনের জায়গা হারানোর ভয়। প্রচণ্ড রোদে লাইন যেন এগোচ্ছেই না। সকাল ১১টাতেও ধীরগতিতে এগোচ্ছিল। সবার মুখে বিরক্তির ছাপ। আলোচনায় বারবার উঠে আসছিল তেল সংকট।
রোববার দুপুর যখন সাড়ে ১২টা। আমরা তখন পাম্প থেকে প্রায় ২শ’-৩শ’ মিটার দূরে। ফুয়েল পাস চেক করে তেল দিতে সময় লাগছিল বেশি। রাতে লাইনে দাঁড়ানোর সময়ই তেলের দাম বেড়েছে, কিন্তু লাইনের ভিড় কমেনি। কোনো লাইন ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তেল নিচ্ছেন যার ফলে সাধারণ মানুষের অপেক্ষা আরও বাড়ছে।
অবশেষে, রাত পেরিয়ে, মশার কামড় খেয়ে, রোদে পুড়ে দুপুর দেড়টার দিকে সেই কাঙ্ক্ষিত তেল পেলাম। শেষ হলো ১৪ ঘণ্টার নাভিশ্বাস অপেক্ষা। আশপাশের বাইকাররা ক্লান্ত শরীর নিয়ে হাসিমুখে সেলফি তুলছে, বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু সবার মুখে একটাই কথা, এই ভোগান্তির শেষ কোথায়? আমরা তেলের স্থায়ী সমাধান চাই। আগের মতো স্বাধীনভাবে সকলে পাম্প থেকে তেল নিতে চাই।