Image description

আমাদের প্রতিবেশী এক চাচা। আমরা তাকে মনা কাকা বলে ডাকি। তার নাম মনোয়ার হোসেন। মনা কাকার ধরাবাঁধা কোনো পেশা নেই। মৌসুম অনুযায়ী কাজ করেন। কৃষক, রাখাল, জেলে, ভ্রাম্যমাণ কাপড় ব্যবসায়ী—সব পরিচয় আছে তার। তিনি কাজ থেকে ফিরে নিয়ম করে চাচির কাজে সহযোগিতা করেন। হাড়িপাতিল ধুয়ে দেন। টিউবওয়েল থেকে পানি তুলে দেন। বাচ্চাকে দূরের টয়লেটে নিয়ে যান।

 

মনা চাচার কাজে পাড়া-প্রতিবেশীরা হাসেন। ঠাট্টা করেন। ‘বউপাগল’ বলে ডাকেন। আমি বউকে বলি, প্রতিটি স্বামীরই তো ‘বউপাগল’ হওয়া উচিত। বউকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। মনা কাকা কিন্তু হজরত মুহাম্মদের (সা.) একটি বড় সুন্নত পালন করছেন। তিনি পারিবারিক কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন।

 

আমাদের বন্ধু আবরার আড্ডায় এক দিন তার পরিবারের গল্প বলল। গল্পটা তার মুখ থেকে শুনি আসি—‘আমাদের যৌথ পরিবার। আমরা মানে আম্মা-আব্বা, ভাই-বোন, আমাদের স্ত্রীরা। রাতের খাবার শেষে প্রতিনিয়তই দীর্ঘ আড্ডা দিই আমরা। আম্মা-আব্বা আড্ডার মধ্যমণি। নানা বিষয়ে কথা হয় আমাদের। কতকথা! কথা ফুরোয় না। পুরনো কথা নতুন আদলে আসে। নতুন গল্প হয়ে ফিরে ফিরে মুখে মুখে ঘুরে।

 

এক দিন রাতে আমার ছোট্ট মেয়ে রোজাকে কোলে নিয়ে আড্ডায় বসছি। রোজার বিরক্তিকর সবকিছু আমি সহ্য করছি। আড্ডায় আমার মনোযোগ নেই দেখে বাবা বললেন, ‘ওরে রুমে রেখে আয়। এত আদর ভালা না।’ মা বললেন, ‘আপনি তো পোলাপানরে কোলে নিয়ে দেখেননি তেমন। আপনি আদরের কী বুঝবেন। আপনি আমারেও কোনো কাজে সহযোগিতা করেননি।’ বাবা চুপ হয়ে রইলেন।

 
 

 

ছোট ভাই হাসান বলল, ‘আম্মা ঠিকই বলেছেন। আম্মার কোনো কাজে আব্বাকে সহযোগিতা করতেও দেখিনি।’ বাবা দেখলাম, লজ্জায় লাল হয়ে গেছেন। আমি সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বাবার প্রশংসায় বললাম, ‘বাবা সারাজীবন কষ্ট করে আমাদের কতটা সুখে রেখেছেন। আমাদের এত সুন্দর অবস্থানের জন্য বাবা তো জীবনটাই ক্ষয়ে দিয়েছেন। এমন ভালো বাবা আছে কেউ? আমার জীবনে দেখেনি।’ বাবা এবার স্বাভাবিক হলেন।

 

বন্ধুকে বললাম, পরিবার মানুষের প্রশান্তির জায়গা। ভালোবাসা আদান-প্রদানের আঁতুড়ঘর। এখানে সৃষ্টি হয় ভালোবাসার প্রবাহিত ঝরনাধারা। ফোটে মহব্বতের গোলাপ-হাসনাহেনা। পুরুষ তো পরিবারের জন্য নিজের জীবনটা ব্যয় করেনই, তবে পারিবারিক কাজে পুরুষের সহযোগিতা নারীকে আরও বেশি আনন্দ দেয়।

 

জগতশ্রেষ্ঠ মানুষ মুহাম্মদ (সা.) পারিবারিক কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন। মদিনা পরিচালানা, সাহাবায়ে কেরামকে দীন শেখানো, আমল-ইবাদত ইত্যাদি কত ব্যস্ততাই ছিল তাঁর। তবুও স্ত্রীদের ঘরের কাজে সহযোগিতা করতেন। আর আমরা কাজ থেকে ফিরে জামাটা ছেড়ে নানা রকম ফরমাইশ দিতে শুরু করি স্ত্রীকে। কর্মস্থলে ঠিকই নানা কাজ করি, কিন্তু বাসায় ফিরলে রাজা বনে যাই।

 

আসওয়াদ (রা.) বলেন, ‘আমি আয়েশাকে (রা.) জিজ্ঞেস করলাম, নবী (সা.) ঘরে কী কাজ করতেন? জবাবে বলেন, তিনি পারিবারিক কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। যখন নামাজের সময় হতো, উঠে নামাজে চলে যেতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৩৯)

 

আরেক হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের কাপড় নিজে সেলাই করতেন। জুতা মেরামত এবং সাংসারিক যাবতীয় কাজ করতেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৩৭৫৬)