Image description

মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার জেরে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য মাইলের পর মাইল লাইন।

জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় দেশজুড়ে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। জনজীবনের এমন চরম ভোগান্তির মধ্যেই সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একলাফে অনেকটা বাড়িয়েছে সরকার।
একই সঙ্গে প্রস্তুতি চলছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও। সব মিলিয়ে জ্বালানির ভোগান্তির সঙ্গে দরজায় কড়া নাড়ছে লোডশেডিং, যা সরকারের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’।

 

জ্বালানি নিয়ে দেশের বাস্তব চিত্র এখন ভয়াবহ। সরেজমিনে দেখা গেছে, তেলের জন্য ফিলিং স্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় তিন থেকে চার কিলোমিটার পর্যন্ত লম্বা লাইন।

লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন শত শত কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে নাগরিকদের। অথচ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদপ্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দাবি করেছেন, দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত রয়েছে। দেশে এপ্রিল ও মে মাসের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি রয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

সরকারের এই দাবিকে ‘ফাঁকা বুলি’ আখ্যা দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রশ্ন রেখেছেন, ‘যদি জ্বালানির সংকট না থাকে, তাহলে দিনে ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং কেন হচ্ছে?’

গ্রীষ্মের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। বর্তমানে পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা) বিদ্যুতের চাহিদা পৌঁছাচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটে। কিন্তু গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের অভাবে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

শহরাঞ্চলে লোডশেডিং কিছুটা কম হলেও মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে দিনে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় জ্বালানি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎহীনতায় পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে।

সংকট ও লোডশেডিংয়ের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। রোববার (১৯ এপ্রিল) থেকে নতুন এ দাম কার্যকর হয়েছে।

নতুন দর অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলে ১৯ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে দুর্ভোগ ডেকে আনবে। পরিবহন ব্যয় ও কৃষি উপকরণের খরচ বৃদ্ধির ফলে খাদ্যপণ্যসহ সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষ এমনিতেই জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দেবে।

জ্বালানির পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও পরিকল্পনা করছে সরকার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মেনে ভর্তুকির বোঝা কমাতে এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের পেশ করা একটি প্রস্তাব এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বর্তমানের প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ০৪ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারী খুচরা গ্রাহকদের জন্যও ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

সংকট কাটাতে নিয়মিত উৎসের বাইরে গিয়ে বিকল্প দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে সরকার। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়া ভারত, সিঙ্গাপুর, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে ইতোমধ্যে ১৭ হাজার টন এবং সিঙ্গাপুর থেকে ১১ হাজার টন জ্বালানি এসেছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের জরুরি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার সহায়তা চেয়েছেন।

বুধবার অনুষ্ঠিত এশিয়া জিরো এমিশন কমিউনিটি (এজেডইসি) প্লাস অনলাইন সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি জরুরি পদক্ষেপ, ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি রাখে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত এজেন্ডার শীর্ষে থাকা উচিত। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই আহ্বানে দ্রুত ও ইতিবাচক সাড়া দেওয়ারও অনুরোধ জানাই।’

চলমান বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘এই সংকট আমাদের পারস্পরিক নির্ভরতা ও দুর্বলতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। কোনো দেশ এককভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার সমস্যা সমাধানে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত বন্ধ হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল বাংলাদেশে পৌঁছাবে এবং পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বাংলানিউজকে বলেছেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সারা বিশ্বের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। সরকার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। জনগণের ভোগান্তি দূর করতে সরকার প্রয়োজনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’