Image description

বাড়বে না, বাড়ছে না করেও শনিবার রাতে হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। রবিবার সকাল থেকেই রাস্তাঘাটে দেখা যায় তার প্রভাব। কমে যায় গণপরিবহন। পরিবহন মালিকরা সরাসরি কিছু না বললেও বাড়তি টাকায় তেল কিনে আগের ভাড়ায় গাড়ি চালাতে চান না তারা। এমন পরিস্থিতিতে গণপরিবহনের ভাড়াও ‘সমন্বয়ের’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মালিক সমিতির দেওয়া একটি খসড়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে আজ সন্ধ্যায় বসতে যাচ্ছে ভাড়া নির্ধারণ কমিটির বৈঠক। এরই মধ্যে বৈঠকের প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। স্টেকহোল্ডারদের পাঠানো হয়েছে বৈঠকে উপস্থিত থাকার নোটিস।

বিআরটিএর এক কর্মকর্তা ও মালিক সমিতির এক নেতা নিশ্চিত করেছেন, বাস ভাড়া বেড়ে কত হতে পারে তার একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে। সে প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ মহানগরীগুলোতে বাস ভাড়া ৬৪ শতাংশ বাড়ানোর আলাপ তোলা হবে। আর দূরপাল্লার বাসে ৩৭ শতাংশ ভাড়া বাড়াতে চান মালিকরা।

বিআরটিএর তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে মহানগরীতে বাসে প্রতি কিলোমিটারের জন্য যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ২ টাকা ৪২ পয়সা। আর দূরপাল্লায় যাত্রীরা দিচ্ছেন ২ টাকা ৪৫ পয়সা করে। মালিক সমিতির প্রস্তাব অনুযায়ী ভাড়া বাড়লে মহানগরীতে প্রতি কিলোমিটারে বাস ভাড়া হবে ৩ টাকা ৯৬ পয়সা এবং দূরপাল্লায় হবে ৩ টাকা ৩৬ পয়সা।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বৈঠকে আমন্ত্রণ পেয়েছেন। আগামীর সময়কে তিনি জানিয়েছেন, তাকে ফোন দেওয়া হয়েছিল বিআরটিএ থেকে। সন্ধ্যায় ভাড়া সমন্বয় কমিটির বৈঠক হবে। তাতে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা হয় বিআরটিএর চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমরের সঙ্গে। তবে তার দপ্তর থেকে জানানো হয়, তারাই সকাল থেকে চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

দেশে সর্বশেষ বড় পরিসরে ভাড়া বেড়েছিল ২০২২ সালের ৬ আগস্ট। তার আগে মহানগরে বাসের ভাড়া ছিল কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ১৫ পয়সা। বাড়িয়ে করা হয় ২ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ সে সময় কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বাড়ে ৩৫ পয়সা। আর দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ১ টাকা ৮০ পয়সা থেকে করা হয় ২ টাকা ২০ পয়সা।

তখন বেড়েছিল মহানগরে মিনিবাসের ভাড়াও। কিলোমিটার প্রতি ৩৫ পয়সা বেড়ে ২ টাকা ৫ পয়সার জায়গায় করা হয় ২ টাকা ৪০ পয়সা। তবে মহানগরে বাস ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া থাকে আগেরটাই।

ওই সময়ও ডিজেল লিটারপ্রতি বাড়ে ৩৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা ও পেট্রলের দাম বাড়ে লিটারে ৪৪ টাকা। দাম বাড়ার পরে ডিজেল ১১৪ টাকা, অকটেন ১৩৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম হয় ১৩০ টাকা।

এরপর কয়েক দফায় জ্বালানির দাম কমে। কিন্তু এবার তখনকার মতো তেলের দাম এত বাড়েনি। এবার ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা হয়েছে। অকটেন ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা। আর পেট্রল ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে লিটারপ্রতি।

দুইবারের মূল্য বৃদ্ধি খেয়াল করলে দেখা যাবে, ২০২২ সালের জ্বলানির দামের তুলনায় এবার বৃদ্ধির পর তফাৎ খুব বেশি নেই। যদিও ভাড়া বাড়ানোর আবদারে ব্যাপক তফাত রয়েছে। তখন সর্ব্বোচ ভাড়া বেড়েছিল ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। আর এবার ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর আলোচনা উঠবে।

এর পেছনে অবশ্য যুক্তি দিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুদ। তার কথায়, ‘এই সময়ের মধ্যে বেড়েছে সব কিছুর খরচ। বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রাংশের দাম। শুধু তেলের দাম দেখেই তো হবে না। আছে আরও অনেক খরচ।’

জোবায়ের মাসুদের ভাষ্য, ‘তখন ৮২ টাকায় ১ ডলার পাওয়া যেত। এখন তা ১৩০ টাকা। আমাদের সব কিছু আমদানি নির্ভর। শুধু ডলারের কারণেই খরচ বেড়ে গেল ৫০ শতাংশ।’

এসবের ভর্তুকি কোত্থেকে আসবে? এমন প্রশ্ন তুলে তার দাবি, ‘বাসের ভাড়া ঢাকায় অন্তত ৪ টাকা ১০ পয়সা হওয়া উচিত। আর দূরপাল্লায় সাড়ে ৩ টাকা। কারণ ঢাকায় ১৬ ঘণ্টা বাস চালিয়েও ১৬০ কিলোমিটার চলা যায় না। আয় না হলেও খরচ তো ঠিকই হচ্ছে।’

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বাসের ভাড়া বাড়ানোর জন্যও দেওয়া হয় চিঠি। সেই চিঠি আগামীর সময়ের কাছে সংরক্ষিত আছে। তাতে মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৩ টাকা ৬০ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ৩ টাকা করার প্রস্তাব উল্লেখ আছে।

গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যানের ভাড়া পুনর্নির্ধারণের আবেদন জানিয়ে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর এ-সংক্রান্ত চিঠি দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। চিঠিতে ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানানো হলেও নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।

কিন্তু মৌখিকভাবে মহানগরীতে কিলোমিটারপ্রতি ১ টাকা ১৮ পয়সা ও দূরপাল্লায় ৫০ পয়সা করে বাড়ানোর কথা জানানো হয় সরকার সংশ্লিষ্টদের। ওই বছর ঢাকায় আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সভায় ওঠে বাস ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা।

ওই সভায় উত্থাপন করা হয় সুপারিশ। তারপর দাবি জানিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে সরকারকে চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে বলা হয়, ‘২০২২ সালের ৬ আগস্ট শুধু ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ভিত্তিতে দূরপাল্লার ও মহানগরীতে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। তবে ওই সময় গাড়ির টায়ার-টিউব, লুব্রিকেন্ট, ব্রেক-সু এবং অন্যান্য খুচরা যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ট্রাক, পিকআপ, মিনি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইমমুভারের (পণ্যবাহী যান) ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা না থাকায় এসব যানবাহনের ভাড়া সমন্বয় বা বৃদ্ধি করা হয়নি।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলমের ভাষ্য, যৌক্তিক হারে ভাড়া না বাড়ালে কঠিন হয়ে যাবে গাড়ি চালানো। সব কিছুর দাম বাড়ছে, বাস ভাড়া কেন বাড়বে না। আর যদি বাসের ভাড়া বাড়ানো না হয়, তাহলে যন্ত্রাংশের দাম কমাতে বলব।

সাধারণত বাসের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে জ্বালানির মূল্য, গাড়ির দাম, যদি ব্যাংক ঋণ থাকে তাহলে সুদের হার, যন্ত্রাংশের মূল্য এবং গাড়ির মানসহ বিবেচনা করা হয় ২২টি বিষয়। একই সঙ্গে বাসের অন্তত ৩০ শতাংশ আসন ধরা হয় খালি থাকবে; যেন সব আসনে যাত্রী না থাকলেও মালিকের লোকসান না হয়।

মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সর্বশেষ ভাড়া বাড়ানোর সময় শুধু জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। অন্যান্য খাত গুরুত্ব পায়নি। এখন যন্ত্রাংশের দাম বাড়ছে।

যাত্রীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছেন, ‘ভাড়া কয়েক পয়সা কমলে এই সুফল যাত্রীরা পায় না। কিন্তু বাড়লে ঠিকই তা কার্যকর হয়। আর ভাড়া যেহেতু ৩ পয়সা, ৫ পয়সা করে কমেছিল এখন ১৫ পয়সা বাড়া উচিত। এর বেশি না। উল্টো দিকে মালিকরা যে তাদের নানা খরচের কথা বলে, তাহলে আমরা যাত্রীরাও তো বলতে পারে সেবার মানের কথা। ভাঙা বাসে উন্নত সেবার মানের ভাড়া দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না।’

 আগামীর সময়