স্বল্প বেতনের সরকারি চাকরি হলেও জীবনযাপন বিলাসিতার চূড়ায়—এমন বৈপরীত্য ঘিরে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে উঠেছে বিস্ফোরক সব দুর্নীতির অভিযোগ।
অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা এই কর্মকর্তাকে ঘিরে স্থানীয় মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার রাতে নিজের ফেসবুক পোস্টে প্রবাসী সাংবাদিক নাজমুস সাকিব এসব তথ্য জানান।
তিনি দাবি করেন, মাসিক প্রায় ৪৫ হাজার টাকার বেতনের বিপরীতে জাকির হোসেন কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন। দুর্নীতি, জালিয়াতি, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এসব সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নাজমুস সাকিবের পোস্ট ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার তেলিনা এলাকায় জাকির হোসেনের নামে ৫৪ শতাংশ জমি রয়েছে, যার দলিলে মূল্য দেখানো হয়েছে ৩০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা; যদিও জমিটির প্রকৃত মূল্য কয়েক কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। একই এলাকায় একটি মার্কেটসহ আরও ১১ শতাংশ জমি কিনেছেন, যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া তেলিনা এলাকায় আরও সাড়ে ৮ শতাংশ জমি কিনেছেন, যার দলিলে মূল্য দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা; তবে বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকারও বেশি বলে দাবি। অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে এসব জমির দলিলমূল্য কম দেখানো হয়েছে। তার নামে একটি বিলাসবহুল গাড়ি থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পোস্টে বলা হয়, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও দুর্নীতি দমন কমিশনে দেওয়া অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আড়ালে রেখে সিন্ডিকেটের সঙ্গে আঁতাত করে মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেনের মাধ্যমে তিনি ঢাকা জেলার সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি নিয়ে বর্তমানে কর্মরত আছেন।
আরও অভিযোগ করা হয়, সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদানের পর থেকেই তিনি ব্যাপক ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল অর্থ ও সম্পদের মালিক হয়েছেন। ছাত্রজীবনে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তৎকালীন সরকারের নাম ব্যবহার করে টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন বলে পোস্টে দাবি করা হয়। সরকার পরিবর্তনের পর নিজেকে বিএনপির লোক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলেও উল্লেখ করা হয়। চাকরিতে প্রবেশের পর থেকেই প্রতিটি কর্মস্থলে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রেজিস্ট্রি, ভুয়া দাতা সাজিয়ে জাল দলিল তৈরি, সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি এবং পে-অর্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরিজীবনের দুই বছরের মাথায় নিজ জেলা টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে তিনি ছয়তলা আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেন এবং একটি গাড়ি ক্রয় করেন। মির্জাপুর উপজেলার বাওয়ার কুমারজানি মৌজার পৌর মার্কেটসংলগ্ন এলাকায় ১ বিঘা জমি ৫ কোটি টাকা দিয়ে কেনার কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া তার শ্বশুরবাড়ির এলাকায় ৩ একর জমিতে মাছের ঘের করেছেন।
স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়ির নামে কয়েক একর জমি কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার স্ত্রীর নামে শত ভরি স্বর্ণালংকার ক্রয় করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এমনকি স্ত্রীর মাসিক হাতখরচ ২ লাখ টাকা, যা তিনি আত্মীয়স্বজনদের কাছে বলে থাকেন—এ তথ্যও পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া নিকট আত্মীয়দের নামে ও বেনামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্ত্রী ও সন্তানের নামে ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরে স্ত্রীর নামে ২৫০০ বর্গফুটের একটি আলিশান ফ্ল্যাটে তারা বসবাস করছেন।
অন্যদিকে ঢাকার মিরপুরে ৫ কাঠা জমি কিনে ৭ তলা ভবন নির্মাণ করছেন, যার তিনতলা পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে পোস্টে উল্লেখ করা হয়। পরিবারের ব্যবহারের জন্য একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে এবং তার ছেলে দেশের নামিদামি একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করছে, যার মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা।
পোস্টে আরও বলা হয়, নিজের ক্রয়কৃত গাড়ি থাকা সত্ত্বেও তিনি অফিসে যাতায়াতের জন্য ভাড়া গাড়ি ব্যবহার করেন, যার মাসিক ভাড়া প্রায় ৭০ হাজার টাকা—যা তার বেতনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জাকির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকাটাইমস