পেট্রোল পাম্পের সামনে জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষায় রাত-দিন একাকার। দিন যতই যাচ্ছে তেলপ্রত্যাশীদের লাইন ততই দীর্ঘ হচ্ছে। কেউ কেউ ১২-১৪ ঘণ্টাও কাটিয়ে দিচ্ছেন পাম্পের সামনের লাইনে। এভাবেই তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করছেন যানবাহন চালক ও মালিকরা। এতে একদিকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিক সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে দৈনন্দিন আয়। ফলে পরিবারের ব্যয় মেটাতে পড়ছেন সংকটে। ওদিকে পাম্প এলাকাসহ যতদূর লাইন যাচ্ছে সেখানে লেগে যাচ্ছে তীব্র যানজট। এতে তীব্র ভোগান্তিতে পড়ছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষজন। তবে মানুষের ভোগান্তি কমাতে আগামীকাল থেকে অকটেন সরবরাহ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর বিষয়ে ভাবছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন।
শুক্রবার সরজমিন ঢাকার অন্যতম ব্যস্ততম পেট্রোল পাম্প- তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন ও শাহবাগ এলাকার মেঘনা মডেল সার্ভিস, পূর্বাচল ট্রেডার্স এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ছুটির দিন হওয়ায় আগের চেয়ে দীর্ঘ লাইন। তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করছিলেন অনেকেই। একেকজন বাইকার ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পাম্পের মুখে পৌঁছাতে পারেননি। দুপুরে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে দেখা গেছে, শাহবাগ এলাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে যানজট। ওই এলাকায় নিয়মিত ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি রয়েছে। ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিপরীত দিকে অবস্থিত মেঘনা মডেল সার্ভিস ও পূর্বাচল ট্রেডার্সে তেল নিতে আসা যানবাহনগুলোর ডাবল লাইন করে রাখা হয়েছে। এতে শাহবাগ চত্বর থেকে ছেড়ে আসা যানবাহনগুলো পুনরায় ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকায় এসে বড় ধরনের যানজটের কবলে পড়ছে। এই চিত্র কেবল শুক্রবারের নয়, দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। ব্যস্ততম সড়কের পাশেই ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন পাম্পের অবস্থান। সেখানে দেখা যায়, হাজার হাজার চালক তেল নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা করতে করতে ঝিমুচ্ছিলেন কেউ কেউ। পাশেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। একদিকে ফার্মগেট, আরেকদিকে সংসদ ভবন, জিয়া উদ্যান। গতকাল চালকদের লাইন মহাখালী হয়ে তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। চালকরা লাইনে দাঁড়িয়েছেন রাত থেকেই। এ ছাড়াও ওই সড়কেও দেখা দেয় যানজট। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনকে ঘিরে দু’টি লেন চলে যায় চালকদের দখলে। যার প্রভাব পড়ে চলাচলকারী যানবাহনে। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি ছোট হয়ে যায়।
বাইকাররা, বিশেষ করে রাইড শেয়ারকারী চালকরা বলছেন, উদ্ভূত এই সমস্যার ফলে এখন তাদের আয় কমে গেছে। কেননা, দিনের অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা সময় অপচয় হয় তেল কিনতে। যাত্রী বহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা তেল কিনতে অপচয় করে ফেলছেন। ফলে চাইলেই তেল কিনে আবার সারাদিনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেন না। তবে, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হলে অনেক সময় চালকরা ভাগাভাগি করেও অপেক্ষা করেন। অর্থাৎ, কাছের কাউকে লাইনে দাঁড় করিয়ে জরুরি কাজগুলো করে নেন।
রাজধানীর নিউমডেল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মোরশেদ। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিতে বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় লাইনে দাঁড়ান। পরদির দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছান। মোরশেদ মানবজমিনকে বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি ছোট চাকরি করি। অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় বাসায় আসি। রাত ১০টায় মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তেলের লাইনে দাঁড়াই। সকাল ৮টা পর্যন্ত ছিলাম। এরপর বড় ভাই এসে দাঁড়ান। তিনি বেসরকারি চাকরিজীবী। দুপুর ২টা পর্যন্ত তিনি ছিলেন। এরপর আবারো আমি এসে দাঁড়াই। ছুটির দিনেও বিশ্রামের সুযোগ নেই।
একইভাবে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে জাহাঙ্গীর গেট এলাকায় লাইনে দাঁড়ান পিকআপ চালক খাইরুল আলম। পরদিন বেলা আড়াইটা পর্যন্ত তেল নিতে পারেননি। তিনি বলেন, একবার আমি ঘুমাই। একবার আমার সহযোগী ঘুমায়। এভাবেই রাতটা পার করেছি। এখানে খাওয়া, এখানেই ঘুম। তেল নিতেই জীবন শেষ। ভাড়া নিয়ে যাবো কখন আর সংসার চালাবো কীভাবে?
রাকিবুল খান নামের আরেকজন চাকরিজীবী চালক বলেন, রাত ২টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছি। থাকতে থাকতে পুরো রাত চলে গেছে। এখন পুরোটা দিন চলে যাচ্ছে। জানি না কখন তেল পাবো। এখানে যারা আছি, একজন আরেকজনের মোটরসাইকেল পাহারা দেই। এভাবে এক এক করে জরুরি কাজগুলো সেরে নিই।
ভোর ৫টায় মেঘনা মডেল সার্ভিসে এসে তেলের জন্য সিরিয়াল দেন কার চালক মুবিন। তিনি বলেন, তেল পাওয়ার পরের আনন্দ বলে বোঝানোর মতো না। তেল পাওয়ার আগের কষ্টও বলে বোঝানোর মতো না। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে দুপুরের খাবার নিয়ে বের হই।
একই পাম্পে তেল নিতে এসে আরেকজন রাইডশেয়ারকারী তারেক আজিজ বলেন, দুই মাস ধরে আয় একদমই কমে গেছে। কারণ এখন আর প্রতিদিন ট্রিপ দেয়া যাচ্ছে না। সকাল ৯টার দিকে বাসা থেকে বেরুলে তেল নিয়ে ফিরতে রাত হয়ে যাচ্ছে, তাহলে ট্রিপ মারা যায় কীভাবে? তার মানে প্রতি মাসে ১৫ থেকে ১৮ দিনের মতো কাজ করতে পারছি। আবার, তেল নিলেও ১ হাজার টাকার বেশি নেয়া যাচ্ছে না। যা দিয়ে দুই-তিনদিন হয়তো চলে।
কাউসার নামের আরেকজন বাইকার বলেন, আমার ফুয়েল পাস নেই। তাই সাত থেকে আট ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৫শ’ টাকার তেল নিতে পারছি। তাতে কিছুই হয় না। তাই এখান থেকে একবার নিয়ে আশপাশের অন্য পাম্প খোঁজ করতে হয়। তাহলে ১০ লিটার তেল নিয়ে মোটামুটি চলে যায়। রাতে বাসায় যাওয়ার আগে দু-একটা ট্রিপ মারা যায়।
বাড়তে পারে অকটেন সরবরাহ: গত মাসের তুলনায় এ মাসে অকটেনের সরবরাহ কমেছে। ফলে প্রতিদিন ঢাকাসহ দেশের পাম্পগুলোতে তেল নেয়ার লাইন আরও দীর্ঘ হচ্ছে। অথচ দেশে অকটেনের পর্যাপ্ত মজুত আছে। এ পরিস্থিতিতে রোববার থেকে বাজারে অকটেন সরবরাহ বাড়ানোর চিন্তা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। সংস্থাটি বলছে, বাজারে অকটেনের সরবরাহ ২৫ শতাংশ বাড়ানো হতে পারে। বিপিসি’র চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, বাজারে ২৫ শতাংশ অকটেন বাড়ানোর চিন্তা করছি। যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।